banglahour

জলাবদ্ধতা নয়, এখন সম্ভাবনার ভাণ্ডার: কুমিল্লার প্লাবনভূমিতে মাছ চাষে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

সারাদেশ | মো সেলিম রেজা মুন্সী, কুমিল্লা প্রতিনিধি।

(৩ মাস আগে) ১৬ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৩:১৮ অপরাহ্ন

একসময় বর্ষা মৌসুম এলেই কুমিল্লার বিস্তীর্ণ নিচু অঞ্চল পানিতে ডুবে থাকত। বছরের পর বছর এসব জমি কৃষিকাজের অনুপযোগী থাকায় স্থানীয় মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা ছিল দুর্ভোগের আরেক নাম। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই জলাবদ্ধ প্লাবনভূমিই আজ দেশের অন্যতম সফল স্বাদুপানির মাছ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে অনাবাদি জলাভূমি পরিণত হয়েছে লাভজনক মৎস্য খামারে। এতে যেমন বেড়েছে মাছের উৎপাদন, তেমনি সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থান এবং বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র।

দাউদকান্দি উপজেলাকে কেন্দ্র করে নব্বইয়ের দশকে শুরু হওয়া প্লাবনভূমিভিত্তিক মাছ চাষের এই উদ্যোগ বর্তমানে কুমিল্লার হোমনা, তিতাস, মেঘনা, মুরাদনগর, চান্দিনা ও দেবিদ্বারসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিস্তার লাভ করেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্লাবনভূমির চারপাশে বাঁধ নির্মাণ করে বর্ষার অতিরিক্ত পানিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে মাছ চাষের যে পদ্ধতি চালু করেছিলেন, তা আজ দেশের সফল মৎস্য উন্নয়ন মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার সাতটি উপজেলায় বর্তমানে ৭৪টি প্লাবনভূমিতে প্রায় ৬ হাজার ৭৭০ হেক্টর এলাকায় মাছ চাষ হচ্ছে। এসব প্লাবনভূমি থেকে বছরে প্রায় ৭৩ হাজার ৯৭৮ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। জেলার স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এসব মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা জাতীয় মাছ উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠায় কুমিল্লার প্লাবনভূমির মাছের স্বাদ ও গুণগত মান দেশের বিভিন্ন জেলায় আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা মাছ সংগ্রহ করতে আসেন। শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মৎস্য উদ্যোক্তা, গবেষক ও খামারিরাও এই সফল মডেল সরেজমিনে দেখতে এবং অভিজ্ঞতা নিতে কুমিল্লায় আসছেন।

তবে এই সাফল্যের মাঝেও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন খামারিরা। মাছের খাদ্যের দাম, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় লাভের পরিমাণ কমে এসেছে। তারপরও সম্ভাবনাময় এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন উদ্যোক্তারা।

ইলিয়টগঞ্জের মাছ চাষি মো. জামাল হোসেন বলেন, "প্রায় ১২ বছর ধরে মাছ চাষ করছি। বর্তমানে মাছের খাদ্যসহ বিভিন্ন উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা হলে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।"

চান্দিনার প্লাবনভূমির মাছ চাষি মো. জাকির হোসেন কাজল বলেন, "প্লাবনভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে মাছ বড় হয়। তুলনামূলক কম খাবার ব্যবহার করতে হয়। ফলে মাছের স্বাদ ও গুণগত মান অনেক ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।"

মাছ কিনতে আসা ক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, "প্লাবনভূমিতে মাছ ধরা নিজের চোখে দেখা ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা। এখানকার টাটকা মাছের মানও অনেক ভালো। তাই সরাসরি এসে মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছি।"

কুমিল্লা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমান মজুমদার বলেন, "দাউদকান্দির প্লাবনভূমিভিত্তিক মাছ চাষ এখন সারা দেশের জন্য একটি সফল ও অনুসরণযোগ্য মডেল। নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রতিবছরই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কুমিল্লার উৎপাদিত মাছ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।"

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, উন্নতমানের পোনা ও মাছের খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির আরও বিস্তার ঘটানো গেলে কুমিল্লার প্লাবনভূমিতে মাছ উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও এই খাতের অবদান বাড়বে।

একসময় যে জলাবদ্ধ প্লাবনভূমি ছিল অনুৎপাদনশীল ও অব্যবহৃত, আজ সেটিই কুমিল্লার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, সমবায়ের শক্তি এবং স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে জলাবদ্ধতাকে সম্পদে রূপান্তরের এই সাফল্য দেশের অন্যান্য জলাভূমি অঞ্চলের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮০১৬৭৪০৬২০২৩
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯
অফিস: ৩৯২, ডি আই টি রোড (বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিপরীতে),পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
যোগাযোগ: তাহিরুল ইসলাম, ০১৭৭৮০০৪৭০০ contact@banglahour.com
অফিসিয়াল মেইলঃ banglahour@gmail.com
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল