banglahour

শিক্ষা প্রকৌশল ঢাকা মেট্রো অফিসে টাকার লেনদেন, আসলে কী ঘটেছিল

অনুসন্ধান | স্টাফ রিপোর্টার। ঢাকা।

(২ ঘন্টা আগে) ১৭ আগস্ট ২০২৬, সোমবার, ৩:৩৩ অপরাহ্ন

 

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের অফিস কক্ষে টাকা লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশের পর শিক্ষা প্রশাসনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে ভিডিওটির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এটি ২০২২ সালের ২৬ মে ধারণ করা। সে সময় হাসান শওকত ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভিডিওতে যাদের দেখা যাচ্ছে, তারা দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও প্রতিনিধি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে অর্থ লেনদেন হয়েছিল দুই ঠিকাদারি পক্ষের মধ্যে। দরপত্রের মাধ্যমে পাওয়া একটি কাজ এবং সেই কাজের জামানতের অর্থ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াই ভিডিওতে ধারণ করা হয়।

ভিডিওতে থাকা দুই পক্ষ এবং সে সময় উপস্থিত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দরপত্রের মাধ্যমে সরকারি বাঙলা কলেজের একটি ভবনের কাজ পায় ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। কাজটির মূল্য ছিল ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৪ লাখ টাকা পারফরম্যান্স গ্যারান্টি বা জামানত হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছিল।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কাজটি পাওয়া ঢালী কনস্ট্রাকশন পরে ঋণখেলাপি হয়ে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে। এতে বাঙলা কলেজের ভবন নির্মাণের কাজ আটকে যায়। পরে কাজটি এগিয়ে নিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেল উদ্যোগ নেয়।

ঢালী কনস্ট্রাকশন দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন যুবলীগ নেতা রাকিব হোসেন মিরনের প্রতিষ্ঠান মিরন এন্টারপ্রাইজ তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কাজটির বাকি অংশ শেষ করার বিষয়ে চুক্তি করতে আগ্রহী হয়। তখন ঢালী কনস্ট্রাকশনের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়, কাজ পাওয়ার সময় নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকে জমা দেওয়া পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ তাদের পরিশোধ করতে হবে।

ঢালী কনস্ট্রাকশনের মালিক এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাক্ষী রাখতে চান। কারণ রাকিব হোসেন মিরন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় পরবর্তী সময়ে জামানতের অর্থ পাওয়া নিয়ে তাদের আশঙ্কা ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ কারণে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কাজ ও জামানতের অর্থ হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি করা হয়।

বিষয়টির প্রমাণ রাখার জন্য মিরন এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী ইকবাল হোসেন ভিডিওটি ধারণ করেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভিডিওটি গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই ধারণ করা হয়েছিল।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একটি অফিস কক্ষে একজন কর্মকর্তা বসে আছেন। তিনি হাসান শওকত, যিনি তখন ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন এবং বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সামনে আরও তিনজন ব্যক্তি বসে আছেন। তাদের মধ্যে দুজনের মধ্যে অর্থ লেনদেন হতে দেখা যায়।

সাদা শার্ট পরা ব্যক্তিকে ভিডিওতে টাকা গ্রহণ করতে দেখা যায়। তিনি ঢালী কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ। আর টাকা দেওয়া ব্যক্তি রাকিব হোসেন মিরন, যিনি মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক। তাঁর পরনে ছিল চেক শার্ট। পেছনে আরও একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং আরেকজনকে ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়।

ভিডিওতে টাকা দেওয়ার ব্যক্তি রাকিব হোসেন মিরন বলেন, ঢালী কনস্ট্রাকশন দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় কাজটি করতে পারছিল না। তখন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এ ধরনের কাজে লাভ খুব বেশি না হলেও কর্মকর্তাদের অনুরোধে তাঁরা কাজটি নেন। অর্থাৎ তাঁরা তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কাজটি গ্রহণ করেন। অবশিষ্ট কাজ শেষ করা এবং বিল তাঁদের অ্যাকাউন্টে দেওয়ার জন্য লিখিত চুক্তি করা হয়েছিল।

মিরন বলেন, ঢালী কনস্ট্রাকশন কাজ পাওয়ার সময় যে পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ জমা দিয়েছিল, সেটি তারা দ্রুত ফেরত নিতে চাচ্ছিল। এর পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে চুক্তির দিন ৫ লাখ টাকা তাঁদের হাতে দেওয়া হয়। পরে অর্থ গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে যেন কোনো পক্ষ অস্বীকার করতে না পারে, সে জন্য তাঁর অফিসের ইকবাল নামের একজন কর্মচারী ভিডিওটি ধারণ করেন।

ভিডিওটি কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমের হাতে গেল, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। তাঁর দাবি, ওই অর্থ লেনদেনে কোনো অবৈধতা বা ঘুষের বিষয় ছিল না এবং এ বিষয়ে গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ঢালী কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ও ভিডিওতে টাকা গ্রহণকারী ফিরোজ আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, রাকিব হোসেন মিরন সে সময় যুবলীগের নেতা ছিলেন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন। ফলে জামানতের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে তাঁদের আস্থার সংকট ছিল। এ কারণে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতের সামনে অর্থ লেনদেন করা হয় এবং তাঁকে সাক্ষী রাখা হয়। ফিরোজ আহমেদের দাবি, হাসান শওকত কোনো অর্থ নেননি।

বিষয়টি সম্পর্কে তৎকালীন ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান শওকত বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি এবং কাজ হস্তান্তর হয়েছিল। পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থও তাঁরা নিজেরা একে অপরকে দিয়েছেন। তবে তাঁকে ঘুষ নেওয়ার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে, যা তিনি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

কাজ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এবং সরকারি কার্যালয়ে এ ধরনের চুক্তির আইনি দিক সম্পর্কে হাসান শওকত বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষ কাজ শেষ করে থাকে এবং এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। তাঁর জানা মতে, এ ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় হয়নি। তাঁর সামনে অফিস কক্ষে দুই পক্ষের অর্থ লেনদেন আইনগতভাবে অপরাধ কি না, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন। তবে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছ থেকে তিনি কোনো অর্থ নেননি এবং তা কেউ প্রমাণও করতে পারবে না।

এদিকে রাজধানীর শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের একটি ভবন নিয়ে আরেকটি অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, আটতলা ভবন নির্মাণ করা হলেও ১০ তলা ভবনের বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নথি ও তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে প্রথমে ১০ তলা ভবনের ভিত্তি নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে স্থাপনাটি কেপিআইভুক্ত হওয়া এবং বঙ্গভবনের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় পরে আটতলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নথি অনুযায়ী, ভবনটির দরপত্র মূল্য ছিল ২২ কোটি ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪৫০ টাকা। পরে সংশোধিত প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৯ কোটি ৪৯ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫০ টাকা।

এরপর আটতলা ভবনের কাজ শেষ করে ঠিকাদার ১৫তম চলতি ও চূড়ান্ত বিল জমা দেন। ওই বিলে মোট ১৭ কোটি ৮৪ লাখ ১২ হাজার টাকা দাবি করা হয়। নিরীক্ষা শেষে প্রথম থেকে ১৪তম বিল বাবদ ১৭ কোটি ২৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। চূড়ান্ত বিল থেকে ৮৫ হাজার টাকা স্থগিত রাখা হয়। ফলে নবম ও দশম তলার কাজের জন্য কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি বলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায়।

হাসান শওকত নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধে সহায়তা করেছিলেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে এ বিষয়ে পাওয়া নথিতে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।

২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেট্রো সার্কেল থেকে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়। অধীনস্থ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়। ওই চিঠিতে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতের স্বাক্ষর রয়েছে।

সবশেষে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, তাঁরা বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখেছেন। এর সত্যতা সম্পর্কে তাঁরা এখনো নিশ্চিত নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হবে।

উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮০১৬৭৪০৬২০২৩
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯
অফিস: ৩৯২, ডি আই টি রোড (বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিপরীতে),পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
যোগাযোগ: তাহিরুল ইসলাম, ০১৭৭৮০০৪৭০০ contact@banglahour.com
অফিসিয়াল মেইলঃ banglahour@gmail.com
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল