
(১৪ ঘন্টা আগে) ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার, ৪:২৬ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সংগীতে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ তাকে "গানের পাখি" এবং চলচ্চিত্রের গানে অসামান্য অবদানের জন্য "প্লে-ব্যাক সম্রাজ্ঞী" উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
সাবিনা ইয়াসমিন একজন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানের পাশাপাশি তিনি দেশাত্মবোধক গান থেকে শুরু করে উচ্চাঙ্গ, ধ্রুপদী, লোকসংগীত ও আধুনিক বাংলা গানসহ বিভিন্ন ধারার নানান আঙ্গিকের সুরে গান গেয়ে নিজেকে দেশের অন্যতম সেরা সংগীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন
সাবিনা ইয়াসমিন ১৯৫৪ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর আজকের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা লুতফর রহমান ছিলেন ব্রিটিশ রাজের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা এবং মাতা বেগম মৌলুদা খাতুন। তার পৈতৃক বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলার বল্লী ইউনিয়নের মুকুন্দপুর গ্রামে। তার পাঁচ বোনের মাঝে চার বোনই সংগীতের সাথে যুক্ত। তারা হলেন ফরিদা, ফৌজিয়া, নীলুফার এবং সাবিনা ইয়াসমিন। তার আরেক বোন নাজমা ইয়াসমিন। তার ভগ্নীপতি চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা, সুরকার খান আতাউর রহমান এবং তার ভাগ্নে সংগীতশিল্পী আগুন।
সাবিনা ইয়াসমিন তার বাবার চাকরির সূত্রে নারায়ণগঞ্জে বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই তিনি গানের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। তার মা মুর্শিদাবাদে ওস্তাদ কাদের বক্সের কাছে গান শিখেন। তার বড় বোন ফরিদা ও ফৌজিয়া দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখতেন।
সাবিনা ইয়াসমিন শৈশব থেকে গানের তালিম নেওয়া শুরু করেন। তিনি সাত বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে গান পরিবেশন করেন এবং খেলাঘর নামে একটি বেতার অনুষ্ঠানে ছোটদের গান করতেন তিনি। ১৯৬২ সালে নতুন সুর চলচ্চিত্রে রবীন ঘোষের সুরে ছোটদের গানে অংশ নেন তিনি। চলচ্চিত্রে সংগীত শিল্পী হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৭ সালে আগুন নিয়ে খেলা চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। ১৯৭২ সালে অবুঝ মন চলচ্চিত্রের "শুধু গান গেয়ে পরিচয়" গানে কণ্ঠ দিয়ে প্রথম জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। ১৯৭৬ সালে তিনি সুজন সখী চলচ্চিত্রের "সব সখীরে পার করিতে" গানের জন্য শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন এবং এরপর গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮), সুন্দরী (১৯৭৯) ও কসাই (১৯৮০) চলচ্চিত্রের জন্য আরও তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
১৯৮০-এর দশকে তার গাওয়া "জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো", "আমি রজনীগন্ধা ফুলের মত" ও "চিঠি দিও প্রতিদিন" গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই সময়ে তিনি চন্দ্রনাথ (১৯৮৪), প্রেমিক (১৯৮৫), রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত (১৯৮৭) ও দুই জীবন (১৯৮৮) চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে চারটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর তিনি দাঙ্গা (১৯৯১), রাধা কৃষ্ণ (১৯৯২), দুই দুয়ারী (২০০০), দুই নয়নের আলো (২০০৫), ও দেবদাস (২০১৩) চলচ্চিত্রের গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। সর্বশেষ পুত্র (২০১৮) চলচ্চিত্রের গানের জন্য ১৪তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল "জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো", "সব ক’টা জানালা খুলে দাও না", "ও আমার বাংলা মা", "মাঝি নাও ছাড়িয়া দে", ও "একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার"। গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি ২০১০ সালে চ্যানেল আইয়ের সেরা কণ্ঠ অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
সাবিনা ইয়াসমিন সংগীতে অবদানের জন্য সম্মাননা পেয়েছেন অনেক বার। যেমন - ১৯৮৪ সালে একুশে পদক, ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার মোট ১৪টি, বাচসাস পুরস্কার মোট ৬টি। বিএফজেএ পুরস্কার মোট ১৯৯১ সালে। উত্তম কুমার পুরস্কার ১৯৯১ সালে, এইচ এম ভি ডাবল প্লাটিনাম ডিস্ক, বিশ্ব উন্নয়ন সংসদ থেকে সংগীতে 'ডক্টরেট' ডিগ্রি লাভ করেছেন ১৯৮৪ সালে, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৯৭৫ সালে চলচ্চিত্র পূবাণী চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৯৯০ সালে শেরে বাংলা স্মৃতি পদক, ১৯৯২ সালে অ্যাস্ট্রোলজি পুরস্কার,১৯৯২ সালে জিয়া স্মৃতি পদক এবং নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে পান ‘বেস্ট সিঙ্গার’ পুরস্কার। ২০১৭ সালে দশম স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড-দ্য ডেইলি স্টার জীবনের জয়গান উৎসবের আজীবন সম্মাননা পান তিনি। ২০২৬ সালে সাবিনা ইয়াসমিন পঞ্চম বাইফা এওয়ার্ড এর আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন।
বাংলাদেশের কিংবদন্তি সংগীত শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের ৭২তম জন্মদিনে বাংলা আওয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।