
(৪ ঘন্টা আগে) ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১:২৮ অপরাহ্ন
ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাটি কেন্দ্র করে দেশের শিল্পী সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সংগঠনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুরো শিল্পী সমাজ স্পষ্টত "দুইভাগে বিভক্ত" না হলেও, প্রতিবাদের ধরন এবং অতীত ঘটনার নীরবতা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও শিল্পীদের মাঝে একটি তীব্র বিতর্ক ও মতভেদ দেখা দিয়েছে।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতিকর্মী, অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতারা বাঁধনের ওপর এই 'মব সন্ত্রাস' ও হামলার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
'আমরা শিল্পীবৃন্দ'-এর ব্যানারে শতাধিক শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজনৈতিক আদর্শ বা মতপ্রকাশের কারণে কোনো শিল্পীর শরীর বা স্বাধীনতায় আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না। ২৪-এর জুলাই আন্দোলনে বাঁধনের সক্রিয় ভূমিকা ছিল এবং সেই কারণে তাকে টার্গেট করা হয়েছে বলে শিল্পীরা মনে করছেন।
সাফা কবির এটিকে অনভিপ্রেত ও লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করেছেন।
মৌসুমী হামিদ মন্তব্য করেছেন যে, "এই দেশে শিল্পী হওয়াটাই যেন দায়, তবে যেকোনো শিল্পীর ওপর হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।"
এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম, অভিনেত্রী পরীমনি, জাকিয়া বারী মম এবং কাজী নওশাবা আহমেদসহ অনেক তারকা ক্ষোভ প্রকাশ করে অনতিবিলম্বে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
২. শিল্পী সমাজের একটি বড় অংশ যখন রাজপথে প্রতিবাদ করছেন, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ জনগণ ও শিল্পীদের একাংশের মন্তব্যে ভিন্ন সুর ও প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে।
বাঁধনের উপর হামলার ঘটনায় সরব এবং অন্য শিল্পীদের উপর হামলার ঘটনায় নিরব থাকায় এর প্রতিবাদ করেছেন অনেকেই।
ইতালিতে আজমেরী হক বাঁধনের হেনস্তার ঘটনার পর চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি এক ভিডিও বার্তায় কড়া মন্তব্য করে বলেছেন যে তিনি বাঁধনকে "নারী বা শিল্পী কোনোটিই মনে করেন না"।
অভিনেতা সাইমন সাদিক বাঁধনের প্রতি মানুষের সহানুভূতিকে 'মায়াকান্না' বলে মন্তব্য করে বলেন, "বাঁধন নারী তো অন্য অভিনেত্রী বা নেত্রীরা কি নারী না ?"
অনেক নেটিজেন এবং সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন যে, দেশের অভ্যন্তরে যখন মমতাজ বেগমের মতো শিল্পী কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ঘরানার লোকসংগীত শিল্পী ও বাউলদের ওপর হামলা বা হেনস্তা করা হয়েছিল, তখন শিল্পী সমাজের এই বড় অংশকে এভাবে মাঠে নামতে বা তীব্র প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে যেকোনো ইস্যুতেই সামাজিক মাধ্যমে মানুষের মন্তব্য দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। একপক্ষ বাঁধনকে জুলাই আন্দোলনের একজন সাহসী কণ্ঠ হিসেবে দেখে তার ওপর হামলার সর্বোচ্চ বিচার দাবি করছে।
অন্যপক্ষ তার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পাল্টা সমালোচনা বা ট্রোল করছে।
তবে কবি, লেখক ও সাংবাদিক আনিসুল হক এক ফেসবুক পোস্টে তার সাথে বাঁধন ও চঞ্চল চৌধুরীর যৌথ ছবি শেয়ার করে বলেন, "বাঁধন আমার বোন, তাঁকে আক্রমণ করা হলে আমি আহত বোধ করি, চঞ্চল চৌধুরী আমার ভাই, তাঁকে অপমান করার চেষ্টা হলে আমি ব্যথিত হই। আমরা কি সব মত ও পথের সম্প্রীতিময় সুন্দর সহাবস্থানের ও সুস্থ বিতর্কের পরিবেশময় একটা সুন্দর দেশ, গালিগালাজ-হামলামুক্ত পরিবেশের স্বপ্ন দেখা বাদ দেব ? আশা ছেড়ে দেব ?
আশা করি, এই দেশ এই পৃথিবী এই সময় সুন্দর সভ্য গণতান্ত্রিক অহিংস হবে।"
সংক্ষেপে বলা যায়, শিল্পী সমাজ বাঁধনের ওপর হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও এর বিপরীতে "কেন অন্য শিল্পীদের ক্ষেত্রে সমান প্রতিক্রিয়া দেখানো হয় না"—এমন একটি বিতর্ক বা জনমত কেন্দ্রিক বিভাজন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে।