
(৪ ঘন্টা আগে) ১৪ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার, ১:২২ অপরাহ্ন
চারদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ। দুর্গম রহমতপুর দেবারিখোলা অষ্ট আশির চরের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র ভরসা খেওয়ার আলগা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়টি রাতারাতি ভেঙে লুটে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। গত ১ অক্টোবর ভবনটি ভেঙে নেওয়ার পর শ্রেণিকক্ষ ও স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এর মধ্যেই ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা। বিদ্যালয় না থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে অনুমোদন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভেঙে ফেলা হলো?
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙনের অজুহাতে বিদ্যালয় ভবনটি ভেঙে নেওয়া হয়। চর ডিজাইনের বিদ্যালয়টি প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বারান্দাসহ ৪ রুম বিশিষ্ট। নির্মিত ভবনের পাশাপাশি ২০২৬ সালে প্রায় ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে সদ্য নির্মিত ওয়াশ ব্লকের ইটও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মোট ৩৭ লাখ টাকার সরকারি এই সম্পদ অপসারণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয় ভবন ভাঙার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হলে যথাযথ মূল্যায়ন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। তবে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেওয়ার আলগা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লিখিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় আবু বকর, সাহেব আলী ও রোস্তম মিয়া অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ দেখিয়ে ভেঙে নেওয়া হলেও আশপাশে থাকা কয়েকটি বাড়ি এখনো অক্ষত রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যালয়ের সাবেক সহসভাপতি আনোয়ার হোসেনের বাড়ি ও ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানের বাড়িও রয়েছে বলে তাঁরা জানান। ফলে বিদ্যালয়টি ভাঙার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা এবং এর পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল- তা আমাদের বোধগম্য নয়। বিদ্যালয়টির ভাঙা কিছু জিনিস পাশে রেখে বাকীগুলো নদী গর্ভে বিলীনের নাটক সাজিয়েছেন ছাইফুর মেম্বার। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
বিদ্যালয় ভবন না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিশুরা। চরের দুর্গম অবস্থানের কারণে অন্য এলাকায় গিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করাও তাদের জন্য কঠিন। পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা শুরু হলেও পরীক্ষা ও পাঠদানের জন্য কোন পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। খোলা আকাশের নিচে ব্রেঞ্চ বসিয়ে চলছে কার্যক্রম। এতে উদ্বেগ বেড়েছে অভিভাবকদের। দ্রুত বিকল্প শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা করছেন অভিভাবকেরা।
দুর্গম চরাঞ্চলে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম নানা সংকটে পড়ে। তার ওপর একমাত্র বিদ্যালয়টি হারিয়ে যাওয়ায় খেওয়ার আলগার শিশুদের শিক্ষাজীবন নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। একটি সরকারি বিদ্যালয়ের ভবন ভেঙে নেওয়ার অভিযোগ শুধু অবকাঠামো হারানোর ঘটনা নয়; এটি সরকারি সম্পদের সুরক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
উক্ত বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুর ইসলাম জানান, "যেহেতু এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই কর্তৃপক্ষর লিখিত অনুমতি না নিয়ে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাময়িকভাবে পাঠদানের ব্যবস্থা না করে, বিদ্যালয় ঘরটি ভাঙ্গা মোটেও ঠিক হয়নি ।"
বিদ্যালয় সংলগ্ন বাড়ি বর্তমান ম্যানেজিং (অ্যাড হক) কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, "বিদ্যালয়টি ভাঙার ব্যাপারে তাকে জানানো হয়নি । কেন জানানো হয়নি আমি জানি না।"
উক্ত বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহানারা বেগম বলেন, "কমিটির সদস্য ছাইফুর মেম্বার লোকজন নিয়ে বিদ্যালয়টি ভেঙেছে । অপসারণকৃত স্কুলের ইট, লোহার এঙ্গেল, সিঁড়ি ও টিন সব মেম্বার নিয়ে গেছে। কমিটি গঠন ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কেন বিদ্যালয়টি ভাঙা হলো-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, " আমার এতো কিছু জানা নাই।"
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রস্তাবনা যে কমিটির তালিকায় সছাইফুর মেম্বারের নাম রয়েছে সেটি এখনো অনুমোদন হয়নি । অথচ তিনি কমিটির কর্তৃপক্ষ পরিচয় দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে নদী ভাঙনের অজুহাতে বিদ্যালয়টি তড়িঘড়ি করে রাতারাতি ভেঙে নিয়ে গেছেন।
সহকারী শিক্ষক মরিয়ম নিপা বলেন, "বিদ্যালয়ের অবকাঠামো না থাকায় শিক্ষার্থীদের মডেল টেস্ট পরীক্ষা খোলা আকাশের নিচে গাছ তলায় নিচ্ছি।
নিপা আরো বলেন, বিদ্যালয়টি ভাঙার সময় আমি নৈমিত্তিক ছুটিতে ছিলাম ।"
ম্যানেজিং (অ্যাডহক) কমিটির সভাপতি ও পাচগাছি ক্লাস্টারের দায়িত্বে নিয়োজিত উপজেলা সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জাহেদুল ইসলাম বলেন, "উক্ত এলাকার ইউপি মেম্বার ছাইফুল রহমানকে মৌখিকভাবে বিদ্যালয়টি ভাঙার কথা বলেছি । কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদানের বিকল্প কোন ব্যবস্থা না করা, সরেজমিনে স্বশরীরে না যেয়ে ও উর্ধতন কর্তৃপক্ষের লিখিত কোন অনুমোদন না নিয়ে, স্কুলটি ভাঙার মৌখিক আদেশ আপনি দিতে পারেন কিনা-এমন প্রশ্নে তিনি উত্তর না দিয়ে, তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান ।"
অভিযুক্ত যাত্রাপুর ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায় ।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, "অনুমোদন ছাড়া বিদ্যালয় ভবন ভাঙার বিষয়টি গুরুতর অপরাধ। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, "অনুমতি ছাড়া খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙার বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে প্রমাণিত হলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
এখন স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারি সম্পদ অপসারণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বিদ্যালয়ের বিকল্প শ্রেণিকক্ষ ও পাঠদানের ব্যবস্থা করে শিশুদের শিক্ষাজীবন স্বাভাবিক করতে হবে। অন্যথায় নদীবেষ্টিত এই চরের শিশুদের শিক্ষার একমাত্র আশ্রয় হারানোর প্রভাব পড়তে পারে পুরো একটি প্রজন্মের উপর।