banglahour

গীতিকবিদের অধিকার, মর্যাদা, স্বীকৃতি, কল্যাণ ও সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণে ছয় বছরের পথচলাঃ সীরজুম মুনির

বিনোদন | বিনোদন ডেস্ক।

(৮ ঘন্টা আগে) ২২ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৬:২৩ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের গীতিকারদের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে গঠিত "গীতিকবি সংঘ" একটি পেশাদার সংগঠন। ২০২০ সালের জুলাই মাসে কয়েক দফা বৈঠকের মাধ্যমে এই সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। সংগীত জগতের বরেণ্য ও তরুণ গীতিকারদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং গীতিকবিদের সম্মান ও রয়্যালটি নিশ্চিত করতে এই সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি কিছু বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার জবাবে 'গীতিকবি সংঘে'র বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক সীরাজুম মুনির এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে সংঘের কার্যক্রম নিয়ে  বিস্তারিত তুলে ধরেছেনঃ

অদ্যাবধি গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ কী কী কাজ করেছে, সেটি বিস্তারিত পর্যায়ে বলতে গেলে "সংঘজনের গীতিকবিতা"-র মতো আরেকটি বই বের করা সম্ভব।

এতো বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও বড় একটা পোস্ট লিখতে বাধ্য হলাম, যেহেতু সংঘের কার্যক্রম বৃহৎ পরিসরে সংঘটিত হয়েছে।

এই সংঘের সাথে বিগত ৪ টা বছর ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম, বিগত ২ বছর সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম, তাই কাছে থেকেই অসংখ্য কাজের সাথে জড়িত ছিলাম।

*২০২০ থেকে ২০২৬:* গীতিকবিদের অধিকার, মর্যাদা, স্বীকৃতি, কল্যাণ ও সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণে ছয় বছরের পথচলা।

অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে, গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে গীতিকবিদের জন্য আসলে কী করেছে?

প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার আছে। একটি সংগঠনের কাজের সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু সমালোচনা করার আগে সংগঠনটির ইতিহাস, কর্মকাণ্ড এবং বাস্তব অবদান সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। তাই কিছু তথ্য শেয়ার করছি।

গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি গীতিকবিদের সম্মিলিত একটি সংগঠন, যার পথচলা শুরু হয়েছিল এমন একটি বাস্তবতা থেকে, যেখানে বাংলা গানের অন্যতম প্রধান স্রষ্টা গীতিকবিদের অধিকার, সম্মানী, রয়্যালটি ও পেশাগত স্বীকৃতি নিয়ে কথা বলার জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন ছিল।

তাহলে চলুন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ কী কী করেছে, সংক্ষিপ্ত আকারে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলোর একটি চিত্র তুলে ধরি।

১. গীতিকবিদের ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা-

২০২০ সালের ৩ জুলাই দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের গীতিকবিদের অংশগ্রহণে প্রথম সাংগঠনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

২৪ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ। অর্ধশতাধিক গীতিকবির মতামতের ভিত্তিতে সংগঠনের নাম, গঠনতন্ত্র ও সমন্বয় কমিটি চূড়ান্ত করা হয়।

প্রবীণ গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, মনিরুজ্জামান মনিরসহ বহু বিশিষ্ট গীতিকবির সমর্থন ও অংশগ্রহণে সংগঠনটি এগিয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে নিয়মিত কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন, নির্বাচন, সাধারণ সভা এবং সদস্যপদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাংগঠনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. কপিরাইট আইন সংশোধনে সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ-

প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গীতিকবিদের অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ।

১৪ আগস্ট ২০২০ বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তৎকালীন রেজিস্ট্রার, যুগ্ম সচিব জাফর রাজা চৌধুরীর সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, মনিরুজ্জামান মনিরসহ সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল প্রস্তাবিত কপিরাইট আইনে গীতিকবিদের স্বার্থ সংরক্ষণ, গানের মৌলিক স্রষ্টার অধিকার এবং বিদ্যমান জটিলতা নিরসন।

একই মাসে কপিরাইট আইন সংশোধনের বিষয়ে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেওয়া হয়।

অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার প্রথম মাস থেকেই সংগঠনটি গীতিকবিদের অধিকার নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি তুলে ধরেছে।

৩. কপিরাইট ও রয়্যালটি বিষয়ে গীতিকবিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা -

গানের গীতিকবি শুধু একজন লেখক নন, তিনি গানের মৌলিক স্রষ্টাদের একজন।

এই স্বীকৃতি, সৃষ্টিকর্মের মালিকানা, ন্যায্য রয়্যালটি এবং কপিরাইটের সুরক্ষা নিয়ে গীতিকবি সংঘ বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

২০২৬ সালের অক্টোবরে একজন গীতিকবির রয়্যালটি হিসাবসংক্রান্ত অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংগঠনের নেতৃত্ব সরাসরি বৈঠক করে। হিসাব পুনরায় প্রদান ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এটি শুধু আলোচনা নয়, একজন গীতিকবির আর্থিক অধিকারসংক্রান্ত অভিযোগ সমাধানের লক্ষ্যে সরাসরি সাংগঠনিক হস্তক্ষেপ।

৪. বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সহযোগিতায় কপিরাইট কর্মশালা-

১৭ অক্টোবর ২০২৬ বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সহযোগিতায় আগারগাঁওয়ে গীতিকবিদের কপিরাইট কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

এতে কপিরাইট নিবন্ধনের নিয়ম, গীতিকবিদের আইনগত অধিকার, সৃষ্টিকর্মের স্বত্ব সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট জটিলতা নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আয়োজন কেবল সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বাংলাদেশের সব গীতিকবির অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছিল।

৫. কপিরাইট আইনে গীতিকবিদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা-

২০২১ সালে কপিরাইট আইন সংশোধনের আলোচনায় গীতিকার ও সুরকারকে যৌথভাবে গানের প্রণেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ঐকমত্য হয়। অথচ পরবর্তী সংশোধিত আইনের খসড়ায় গীতিকারদের স্বীকৃতি বাদ পড়ার বিষয়টি সামনে আসে।

এই গুরুতর পরিস্থিতিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সভাপতি সিমিন হোসেন রিমির কাছে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার ব্যবস্থা করে।

গীতিকারদের সৃষ্টিকর্মের মালিকানা, কপিরাইট ও রয়্যালটির অধিকার হারানোর আশঙ্কার বিরুদ্ধে সংগঠনের এই হস্তক্ষেপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গীতিকারদের আইনগত স্বীকৃতি ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের সংগ্রামে এটি গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অবদান।

৬. গাজী মাজহারুল আনোয়ারের স্মরণসভা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাঁর অবদান তুলে ধরা-

১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যৌথভাবে কিংবদন্তি গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ারের স্মরণসভার আয়োজন করে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত গীতিকবির পরিবারের সদস্য, দেশের বরেণ্য গীতিকবি, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।

স্মরণসভায় তাঁর কালজয়ী গান সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান তুলে ধরা এবং তাঁর নামে স্থাপনা বা সড়কের নামকরণের দাবিও উত্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

এটি শুধু স্মরণসভা ছিল না। বাংলা গানের একজন কিংবদন্তি স্রষ্টার অবদানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।

৭. প্রয়াত গীতিকবিদের স্মৃতি ও সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ-

২০ জানুয়ারি ২০২৪ প্রয়াত কবি ও গীতিকবি জাহিদুল হকের স্মরণে বিশেষ সভা আয়োজন করে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ।

তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন, গান ও কবিতা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন সংগঠনের সভাপতি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, সাধারণ সম্পাদক আসিফ ইকবাল, সাংগঠনিক সম্পাদক জুলফিকার রাসেলসহ অন্যরা।

প্রয়াত গীতিকবি কে জি মোস্তফা, কাওসার আহমেদ চৌধুরী, ওমর ফারুক বিশাল, বর্ণ চক্রবর্তীসহ বিভিন্ন প্রজন্মের প্রয়াত স্রষ্টাদের অবদান স্মরণ ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সংগঠনের আলোচনায় উঠে এসেছে।

সংগঠনের প্রতিনিধিরা অন্যান্য সংগীতস্রষ্টার স্মরণ আয়োজনেও অংশ নিয়েছেন।

৮. বরেণ্য গীতিকবিদের সম্মাননা ও আজীবন সদস্যদের মর্যাদা প্রদান

প্রবীণ ও বরেণ্য গীতিকবিদের সম্মান জানানো গীতিকবি সংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক চর্চা।

২০২০ সালের শেষ দিকে সংগঠনের নেতারা আজীবন সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে ছবিসহ বিশেষ শুভেচ্ছাপত্র পৌঁছে দেন।

এর মাধ্যমে প্রবীণ গীতিকবিদের প্রতি সম্মান এবং প্রজন্মের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি হয়।

৯. ‘গীতিকবি আড্ডা’ এবং জীবিত কিংবদন্তিদের সম্মাননা

১০ মে ২০২৫ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ‘গীতিকবি আড্ডা’র প্রথম পর্ব।

এই আয়োজনে বাংলা আধুনিক গানের তিন বিশিষ্ট গীতিকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, লিটন অধিকারী রিন্টু ও গোলাম মোর্শেদকে সম্মাননা দেওয়া হয়।

১১ জুলাই ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় পর্ব। অতিথি ছিলেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী ও তরুণ মুন্সী।

এসব আয়োজনে গীতিকবিদের সৃষ্টিশীল যাত্রা, গান লেখার অভিজ্ঞতা, জীবনদর্শন এবং বাংলা গানে তাঁদের অবদান তুলে ধরা হয়।

যাঁরা গান লিখে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁদের জীবন ও সৃষ্টির গল্প নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কাজটিও গুরুত্বপূর্ণ।

১০. ১২৯ জন গীতিকবির সৃষ্টিকর্ম নিয়ে ঐতিহাসিক সংকলন প্রকাশ

২৯ নভেম্বর ২০২৪ প্রকাশিত হয় গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ ও অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্সের যৌথ প্রকাশনা ‘সংঘজনের গীতিকবিতা’।

এই সংকলনে স্থান পেয়েছে প্রবীণ থেকে নবীন ১২৯ জন গীতিকবির সংক্ষিপ্ত জীবনী, ছবি, প্রত্যেকের নির্বাচিত সেরা ১০টি গানের তালিকা এবং একটি করে পূর্ণাঙ্গ গীতিকবিতা।

অর্থাৎ একটি গ্রন্থে ১২৯ জন গীতিকবির পরিচিতি এবং তাঁদের প্রায় ১,৩০০টি নির্বাচিত গানের তথ্য ও পূর্ণাঙ্গ গীতিকবিতা একত্রে সংরক্ষিত হয়েছে।

প্রকাশনার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ, লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনা, তথ্য যাচাই, প্রচ্ছদ প্রস্তুত এবং প্রকাশকের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করা হয়।

এটি বাংলা গানের ইতিহাস ও গীতিকবিদের সৃষ্টিশীল পরিচিতি সংরক্ষণে একটি বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী অবদান।

১১. অসুস্থ ও আর্থিকভাবে বিপদগ্রস্ত গীতিকবিদের পাশে দাঁড়ানো

সংগঠনের একটি মানবিক দিক হলো অসুস্থ, অসচ্ছল কিংবা আকস্মিক বিপদে পড়া সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মোট ৫৩ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের তথ্য রয়েছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী আর্থিক সংকটে পড়া একজন গীতিকবির চিকিৎসায় সংগঠনের সদস্যরা অর্থ সংগ্রহ করেন। অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত ২২ হাজার টাকা সংগ্রহ করে সেই টাকা তাঁর হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

শুধু এই দুটি নথিভুক্ত কার্যক্রমেই অন্তত ৭১ হাজার টাকা সহায়তা প্রদানের তথ্য রয়েছে। আরও অনেক গীতিকবি আছেন যাদের যখন প্রয়োজন হয়েছে, সংঘ তাঁদের পাশে দু'হাত খুলে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়াচ্ছে।

এখানে কারও নাম উল্লেখ করছি না। কারণ একজন অসুস্থ বা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য তাঁকে প্রচারের বিষয় বানানো নয়।

১২. সদস্য ও তাঁদের পরিবারের জন্য হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্যচুক্তি-

৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশের কর্পোরেট স্বাস্থ্যসেবা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এই চুক্তির মাধ্যমে সদস্য ও তাঁদের পরিবারের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, এক্সিকিউটিভ হেলথ চেকআপ, কার্ডিয়াক চেকআপ এবং হাসপাতালের নির্ধারিত চিকিৎসাসেবায় বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সদস্যদের তথ্য যাচাই ও পরিচয়পত্র প্রস্তুতের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

অর্থাৎ সংগঠনটি শুধু গান ও অনুষ্ঠান নিয়ে কাজ করেনি, সদস্যদের স্বাস্থ্য ও পারিবারিক কল্যাণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।

১৩. গীতিকবি ও সুরকারদের স্বতন্ত্র পুরস্কার স্বীকৃতির দাবি-

মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে গীতিকবি ও সুরকারদের জন্য পৃথক পুরস্কার ক্যাটাগরি চালুর দাবিতে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়।

দাবিটির মূল কথা ছিল, একটি গানের জনপ্রিয়তার পেছনে কণ্ঠশিল্পীর পাশাপাশি গীতিকবি ও সুরকারের মৌলিক অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

বিষয়টি এখনও আলোচনার টেবিলে আছে। আশা রাখা যাচ্ছে নিকট ভবিষ্যতে একটা পজিটিভ ফলাফল আসবে।

১৪. সংগঠনের নিজস্ব ওয়েবসাইট উদ্বোধন-

২১ মার্চ ২০২৫ বার্ষিক সাধারণ সভায় গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশের নিজস্ব ওয়েবসাইট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

ওয়েবসাইটে সদস্যদের প্রোফাইল, সংগঠনের পরিচিতি এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়।

ওয়েবসাইট: https://lyricistsassociationbd.com/

এটি গীতিকবিদের পরিচিতি ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ ও তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

১৫. নিয়মিত সাধারণ সভা, সদস্যপদ সম্প্রসারণ ও সাংগঠনিক জবাবদিহি-

২০২৩ সালে ১১ জন নতুন গীতিকবিকে সদস্যপদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে নতুন ও তরুণ গীতিকবিদের সংগঠনে যুক্ত করার কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।

২১ মার্চ ২০২৫ বার্ষিক সাধারণ সভা ও ইফতার অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাধারণ সম্পাদক সাংগঠনিক প্রতিবেদন এবং অর্থ সম্পাদক আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। নতুন সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সাংগঠনিক সভা এবং আর্থিক ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন উপস্থাপন সংগঠন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১৬. গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা-

২০২১–২০২২ মেয়াদের প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের পর ২৯ জুলাই ২০২২ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ভোটগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটি গঠন করা হয়।

২৯ নভেম্বর ২০২৪ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পরবর্তী মেয়াদের ১৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির ফলাফল ঘোষণা, শপথ ও দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।

নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা, মনোনয়নপত্র, লিখিত দায়িত্ব হস্তান্তর এবং নিয়মতান্ত্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

১৭. গীতিকবিদের মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি

২৯ নভেম্বর ২০২৪ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নতুন কমিটির অভিষেক ও ‘সংঘজনের গীতিকবিতা’ প্রকাশনার পাশাপাশি গীতিকবিদের মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

বিভিন্ন প্রজন্মের গীতিকবি ও সংগীতশিল্পীরা এতে অংশ নেন।

সংগঠনের সাধারণ সভা, ইফতার, সম্মাননা অনুষ্ঠান এবং গীতিকবি আড্ডার মতো আয়োজনের মধ্য দিয়েও সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তাহলে গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ কী করেছে?

সংক্ষেপে বললে, সংগঠনটি:

- গীতিকবিদের একটি সম্মিলিত সাংগঠনিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে।
- কপিরাইট আইন সংশোধনের বিষয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং লিখিত দাবি জানিয়েছে।
- গীতিকবিদের রয়্যালটি-সংক্রান্ত অভিযোগ সমাধানে মধ্যস্থতা করেছে।
- বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সহযোগিতায় অধিকার ও নিবন্ধনবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করেছে।
- কপিরাইট আইনে গীতিকবিদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে।
- গাজী মাজহারুল আনোয়ারসহ প্রয়াত স্রষ্টাদের স্মরণে সাংগঠনিক ও যৌথ আয়োজন করেছে।
- জীবিত বরেণ্য গীতিকবিদের সম্মাননা দিয়েছে।
- ১২৯ জন গীতিকবির সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন প্রকাশ করেছে।
- অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত সহকর্মীদের চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তায় পাশে দাঁড়িয়েছে।
- সদস্য ও তাঁদের পরিবারের চিকিৎসাসুবিধার জন্য হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
- গীতিকবিদের সৃজনশীল জীবন তুলে ধরতে ধারাবাহিক আড্ডা আয়োজন করেছে।
- সদস্যদের পরিচিতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম তুলে ধরতে নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করেছে।
- নতুন ও প্রবীণ গীতিকবিদের মধ্যে যোগাযোগ, ঐক্য ও সাংগঠনিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে।

গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ কি তার সব লক্ষ্য অর্জন করেছে? নিশ্চয়ই নয়।

গীতিকবিদের ন্যায্য রয়্যালটি নিশ্চিত করা, কপিরাইট আইনের কার্যকর প্রয়োগ, গানের স্রষ্টাদের যথাযথ সম্মানী এবং পেশাগত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় আরও অনেক কাজ বাকি।

কিন্তু কাজ বাকি থাকা আর কোনো কাজই হয়নি, এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

যে সংগঠন সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গীতিকবিদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করেছে, কপিরাইট আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছে, শতাধিক গীতিকবির সৃষ্টিকর্ম গ্রন্থবদ্ধ করেছে, জীবিত কিংবদন্তিদের সম্মান জানিয়েছে, প্রয়াতদের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করেছে, অসুস্থ সহকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সদস্যদের চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করেছে, সেই সংগঠনকে এককথায় নিষ্ক্রিয় বা অবদানহীন বলা ন্যায়সংগত হবে না।

সমালোচনা হোক, অবশ্যই হোক। কিন্তু সেটি হোক তথ্যের ভিত্তিতে, ইতিহাস জেনে, কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করে।

একটি স্বেচ্ছাসেবী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাফল্য শুধু কতটি অনুষ্ঠান করেছে তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কখনো একটি আইনি দাবি, কখনো একজন অসুস্থ সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানো, কখনো একজন প্রবীণ স্রষ্টাকে সম্মান জানানো, আবার কখনো শতাধিক গীতিকবির সৃষ্টিকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ নিখুঁত নয়। কিন্তু গীতিকবিদের জন্য সংগঠনটির ছয় বছরের কাজ ও অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

আরও ভালো কাজের দাবি তুলুন। গঠনমূলক সমালোচনা করুন। প্রয়োজন হলে নেতৃত্বের জবাবদিহি চান। কিন্তু একটি সংগঠনের দীর্ঘদিনের সম্মিলিত শ্রম, উদ্যোগ এবং অর্জনকে অস্বীকার করার আগে তার ইতিহাসটুকু অন্তত জানুন।

কারণ, ইতিহাসকে অস্বীকার করা সহজ। কিন্তু ইতিহাসের তথ্যকে অস্বীকার করা কঠিন।

লেখকঃ সাংগঠনিক সম্পাদক, গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ।

উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮০১৬৭৪০৬২০২৩
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯
অফিস: ৩৯২, ডি আই টি রোড (বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিপরীতে),পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
যোগাযোগ: তাহিরুল ইসলাম, ০১৭৭৮০০৪৭০০ contact@banglahour.com
অফিসিয়াল মেইলঃ banglahour@gmail.com
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল