banglahour

চুয়াডাঙ্গায় মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে সর্বস্ব হারিয়ে এখন নিঃস্ব ৫ ব্যক্তি

সারাদেশ | রিফাত রহমান। চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি।

(১ দিন আগে) ২৬ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার, ৪:৩৮ অপরাহ্ন

ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ায় বন্দি হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন চুয়াডাঙ্গার ৫ জন ব্যক্তি। প্রচন্ড নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন নিয়ে ১০ মাস পর দেশে নিজ বাড়িতে ফিরলেও নিঃস্ব হয়ে গেছে তারা ও তাদের পরিবার।
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ফুলবগাদী, নিমতলা ও বড়গাংনী গ্রামে গিয়ে জানা গেছে, ফুলবগাদী গ্রামের বাসিন্দা জাহিদ হাসান, কামরুল হাসান, জাহিদুল ইসলাম, নিমতলা গ্রামের আলিফ ও বড়গাংনী গ্রামের ছাব্বির আলী প্রলোভনের শিকার হয়েছেন। বয়সে একুশ থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব এই ৫ জনের স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে দারিদ্র্যতা ঘোঁচানো। সেই স্বপ্নই তাদের ঠেলে দেয় এক ভয়াবহ বিপদের মুখে।
নিমতলা গ্রামের মসজিদপাড়ার বাসিন্দা চায়ের দোকানী আসাদুল, যিনি এলাকায় আপানুর নামে পরিচিত, তার ছেলে মোহাম্মদ আলী হাউসের মাধ্যমে এই ৫ পরিবারের কাছে পৌঁছায় লোভনীয় প্রস্তাব। ইতালিতে মাসে ৪-৫ লাখ টাকা আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কর্মী সংগ্রহের কথা বলা হয়। আপানুরের ছেলে মোহাম্মদ আলী হাউস নিজেই বিদেশে থাকায় ওই প্রস্তাব কেউ সন্দেহ করেনি।


প্রস্তাবে রাজি হয়ে জমি বন্ধক, গবাদি পশু বিক্রি ও স্ত্রীর অলংকার বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে পরিবারগুলো। কেউ কেউ ঋণ নেন এনজিও থেকে। চুক্তি অনুযায়ী অর্ধেক টাকা যাওয়ার আগে এবং বাকিটা ইতালি পৌঁছে দেয়ার শর্তে অর্থ পরিশোধ করেই তারা রওনা দেয়। সরাসরি ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ হয়ে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয় পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন ও ভিসা সংক্রান্ত কাগজপত্র। বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ। আরো ৫৭ জনসহ বন্দি করে রাখা হয় একটি ঘরে। সেখান থেকে একেক জনকে আলাদা করে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়ে তাদের দিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে করানো হতো মোবাইল ফোন কল। তাদের মাধ্যমে দাবী করানো হতো অতিরিক্ত অর্থ। অর্থ দিতে রাজি না হলে শুরু হতো শারীরিক নির্যাতন। নির্যাতনের মধ্যেই পরিবারের কাছে ফোন করিয়ে টাকা চাইতে বাধ্য করা হতো ভুক্তভোগীদের। এভাবে বিভিন্ন দফায় তাদের কাছ থেকে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা। এত অর্থ দেয়ার পরও ইতালি পৌঁছানো হয়নি তাদের, বরং ঝুঁকিপূর্ণ টিউব দিয়ে তৈরি নৌকায় করে সাগরপথে ইতালি পাঠানো হয় তাদের। টিউবি দিয়ে তৈরি নৌকায় সাগর পাড়ি দেয়ার সময় টিউব ফুটো হয়ে তাদের নৌকা ডুবে যাওয়ার আগেই তড়িৎ গতিতে সেখানে কোস্ট গার্ড উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্ধার করে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় ধরা পড়ে বিদেশি কারাগারে বন্দি হন তারা। সেখান থেকে মুক্তি পেতেও দিতে হয় অতিরিক্ত অর্থ। শেষপর্যন্ত অন্য একজন দালালের সহায়তা ও প্রশাসনিক তৎপরতায় দেশে ফেরেন ৫ জন।


দেশে ফিরে টাকা ফেরৎ চাইলে উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযুক্ত দালাল মোহাম্মদ আলী হাউস টাকা ফেরৎ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। 
এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত দালাল হাউসের বাবা আসাদুল ওরফে আপানের দাবি, তার ছেলে কোনো অন্যায় করেননি, ভুক্তভোগীরাই সাগর দেখে ভয়ে নিজেরা পালিয়ে এসেছে। নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।


ফুলবগাদী গ্রামের মসজিদপাড়ার মরহুম খোদ বক্সের ছেলে প্রতারণার শিকার জাহিদ হাসান (৫০) বলেন, তার ৩০০টি ভেড়ার একটি খামার ছিল। ছিল জমি চাষ করার ট্্রাক্টর। তিনি ১২ বছর কুয়েতে ছিলেন। তার ছিল গ্রামীণ স্বচ্ছল জীবন। সব বিক্রি করে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তিনিসহ আরো কয়েকজন ভাল বেতনের প্রলোভনে পড়ে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে স্বপ্ন তার ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। লিবিয়ায় ১০ মাস বন্দি থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে সাগরের বুক থেকে জীবন নিয়ে বেঁচে ফিরে তিনি আজ অসহায় জীবন পার করছেন। নির্যাতেনের শরীর নিয়ে প্রায় সারা দিনই তিনি ঘুমিয়ে কাটান। তিনি ২৯ লাখ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
একই গ্রামের আইজউদ্দিনের ছেলে কামরুল ইসলাম (৪২) জানান, তারও ৬০টি ভেড়ার একটি খামার ছিল। গোয়ালে ছিল ১২টি গরু। সব বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে ,জমি বর্গা দিয়ে তিনি দালালদের ৩২ লাখ টাকার চাহিদা মিটিয়েও পৌঁছাতে পারেননি স্বপ্নের ইতালিতে।


ওই গ্রামের সাহেব আলীর ছেলে জাহিদুল ইসলাম (২১) বলেন, বাড়িতে গরু-ছাগল পুষে সেগুলো বিক্রি করে তার স্বচ্ছল জীবন কাটছিল। ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে দালালদের খপ্পরে পড়ে তিনি সর্ব শান্ত হয়ে গেছেন। তিনিও দালালদের হাতে তুলে দিয়েছেন ৩৪ লাখ টাকা।
নিমতলা গ্রামের এনামুলের ছেলে আলিফ (২১) সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দালালদের প্ররোচনায় পড়ে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তিনি ৩০ লাখ টাকা খুইয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। চলে গেছে সেনাবাহিনীর চাকরিও। এখন তিনি স্তব্দ জীবন কাটাচ্ছেন।


বড়গাংনী গ্রামের সাদ আহম্মদের ছেলে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সরকারি কলেজের ইসলামী ইতিহাসের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছাব্বির আলী। তিনি দৈন্যতা ঘোঁচাতে পড়াশুনা বাদ দিয়ে দালালের মাধ্যমে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে লিবিয়ায় ২২ লাখ টাকা খুইয়ে তাকেও দেশে ফিরে আসতে হয়েছে।       


 চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা জেনেছি এই উপজেলার ৩টি গ্রামের ৫ জন ব্যক্তি অবৈধভাবে বিদেশ গিয়ে প্রচুর অর্থ খুইয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন। আমরা সবসময় বলে আসছি, যারা বিদেশে যেতে চায় তারা যেনো প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হয়ে যেনো বিদেশে যায়। দক্ষ হয়ে বৈধভাবে বিদেশে গেলে তিনি দেশে ও পরিবারের কাছে রেমিটেন্স পাঠিয়ে কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারবেন। এক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা উপজেলার পক্ষ থেকে তাদেরকে সচেতন করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবো। যে পরিবার গুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তারা যদি উপজেলা প্রশাসনের কাছে আসে, তাদের প্রতি সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে।  


জীবন নিয়ে ফিরলেও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সামর্থ্য হারিয়েছে ৫ পরিবার। মাথার ওপর ঋণের বোঝা, আর প্রতারকের বিলাসী জীবনের গল্প শুনতে শুনতে ভেঙে পড়েছেন তারা। মানবপাচারের এই চক্র কবে বন্ধ হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
                    

উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮০১৬৭৪০৬২০২৩
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯
অফিস: ৩৯২, ডি আই টি রোড (বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিপরীতে),পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
যোগাযোগ: তাহিরুল ইসলাম, ০১৭৭৮০০৪৭০০ contact@banglahour.com
অফিসিয়াল মেইলঃ banglahour@gmail.com
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল