banglahour

শুধু বিঘে দুই, ছিল মোর ভূঁই- রবীন্দ্রনাথের কবিতার খলনায়ক বেনজির

অপরাধ | অনলাইন ডেস্ক

(২ বছর আগে) ৩ জুন ২০২৪, সোমবার, ১২:২৭ অপরাহ্ন

 এ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই  দুই বিঘা জমি কবিতারই দৃশ্যায়ন। 

শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’

পাহারের মানুষ সেই উপেনের মতোই বেনজিরের ভূমি দখলের সাক্ষী হয়ে রইলেন।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসহায় গরীবদের নামমাত্র মূল্যে জমিগুলো বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। জ‌মিগুলো নামমাত্র দামে কিনে দখল করে নিতে সহ‌যো‌গিতা ক‌রে‌ছেন স্থানীয় জেলা স্বেচ্ছাসেবকলী‌গের সভা‌পতি মং ওয়াইচিং মারমা এবং দুটি মৌজার হেডম্যান। পর্দার আড়াল থেকে জমিতে যাবার সড়ক নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা। মূলত তার মদদে পাহাড়ি ভূমিগুলো খুব সহজে বেনজীর আহমেদ নিজের এবং স্ত্রী ও মে‌য়ের না‌মে কাগজ করে নিতে পেরেছেন। 

বান্দরবা‌নে দুটি উপজেলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেন‌জীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও মে‌য়ের না‌মে রয়েছে প্রায় একশ একর পাহাড়ি জমি। সদরের সুয়ালক এলাকায় রয়েছে পঁচিশ একরের জমিতে মৎস্য ও গরুর খামার, অবকাশযাপনে বাংলো এবং লামার ডলুছ‌ড়িতে পঞ্চান্ন একরের জমিতে ফলজ-বনজ বাগান ও বাংলো বাড়ি।  স্থানীয়দের কাছে জায়গাগুলো পুলিশ প্রধান আইজিপির জমি নামে প‌রি‌চিত। 

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০১৬ সা‌লে বেন‌জীর আহ‌মেদ, তার স্ত্রী জীশান মির্জা ও মে‌য়ে ফারহীন রিশতা বিন‌তে বেনজীরের না‌মে বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের ৩১৪ নম্বর সুয়ালক মৌজায় ৬১৪ নম্বর দা‌গে ও ৩ নম্বর শিটে ২৫ একর জায়গা লিজের ভিত্তিতে নেন বান্দরবান পৌরসভার বাসিন্দার আবুল কা‌শেমের ছেলে শাহজাহা‌নের কাছ থে‌কে। 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, লিজ নেওয়া পঁচিশ একর জায়গা জুড়ে মৎস্য ও গরুর খামার এবং পাহাড়ে অবকাশ যাপনের জন্য দোতলা একটি বাংলো বাড়িও তৈরি করেন। খামারে বিক্রিযোগ্য ৩৫‌টি গরুও রয়েছে। সব‌চে‌য়ে বড় গরুটির দাম আড়াই লাখ টাকা বলেও জানিয়েছেন খামারের কর্মচারী।

এদিকে খামারে যেতে সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা এবং বিদ‌্যুৎ সং‌যোগও। অবকাশযাপ‌নে তৈরি করা দোতলা বাংলোয় রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে এসিও। কাঁটাতা‌রের বেড়ায় ঘেরাও খামারের চারপাশে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের ফলজ এবং বনজ গাছ। বাগানের প্রবেশমুখে তালাবদ্ধ আকর্ষণীয় গেট।

অপরদিকে লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের ডলুছ‌ড়ি মৌজার টংগ‌ঝি‌রি‌তে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর পরিবারের নামে র‌য়ে‌ছে ৫৫ এক‌র পাহাড়ি জমি। সেখানে গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন ধরনের মিশ্র ফ‌লের ও বনজ গাছের বাগান। সেখানেও তৈরি করেছেন একটি বাংলো। পাহাড়ের গোটা জায়গাগুলো ঘুরে বেড়াতে লেগে যায় পুরোটা দিন।

বেনজীরের খামা‌রের দা‌য়ি‌ত্বে নিয়োজিত নজুম উদ্দিন, লেদু মিয়া বলেন, খামারসহ এ জায়গাটির সবকিছু দেখাশোনা করেন মূলত মং ওয়াইচিং দাদা। তিনি বান্দরবান জেলা সদরের মধ্যমপাড়াতে থাকেন। তবে এই জায়গাটির মালিক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহ‌মে‌দ। খামারে বর্তমানে বাচ্চাসহ ৩৭‌টি গরু রয়েছে। বাজারে বিক্রয়‌যোগ‌্য গরু র‌য়ে‌ছে ৩৫‌টি। সবচেয়ে বড় গরুটি দাম পড়বে কম হলেও আড়াই লাখ টাকা।

এদিকে ডলুছ‌ড়ি মৌজার টংগঝি‌রি‌তে একটা সময়ে অসহায় ও গরীব অনেকগুলো প‌রিবারের বসতি ছিল দূরে দূরে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেনজীর আহমদ স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় নামমাত্র দামে টাকা দিয়ে গোটা ৫৫ একর জমি জোরপূর্বক দখল করে পাহাড়ের জমিগুলো থেকে বসবাসকারীদের স‌রে যে‌তে বাধ্য করেছেন। অথচ অসহায় পরিবারগুলোর বেঁচে থাকার একমাত্র সম্ভল ও আয়ের উৎস ছিল পাহাড়ের জমিগুলো।

ডলুছ‌ড়ি মৌজার অজিত ত্রিপুরা ব‌লেন, জায়গাগুলো যখন দখল করে নিচ্ছিল তখন আমি মোটামুটি ছোট ছিলাম। তখন দেখেছি মং ওয়াইচিং এসে আমার বাবার কাছে ১ লাখ টাকা দি‌য়ে জোর ক‌রে ৫ একর জায়গা দখ‌ল করে নি‌য়ে‌ছে। একইভাবে পাড়া প্রতিবেশী অনেকের কাছ থে‌কে জায়গা নি‌য়ে‌ছে। তখন প্রতিবাদে চেষ্টা করলে লামা ও বান্দরবান থে‌কে পু‌লিশের লোকজন গিয়ে আমা‌দে‌র নানাভাবে হয়রা‌নি ক‌রত। এত‌দিন ভ‌য়ে কথাগুলো কাউকে ঠিকমত বল‌তে পা‌রি‌নি। কিন্তু পাহাড়ি নেতারা জানত, তারা অসহায় ছিল।

ডলুছ‌ড়ি মৌজার সা‌বেক মেম্বা‌র ফাইসা প্রু বলেন, আমার এলাকায় বেনজীর আহ‌মে‌দ পরিবারের ৫৫ একর পাহাড়ি জমি র‌য়ে‌ছে। জমি‌গুলোতে একটা সময়ে অসহায় অনেকগুলো প‌রিবা‌রের বসবাস থাক‌লেও বর্তমানে গোটা জায়গাটি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার দখলে রয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ভাগিনা আওয়ামী লীগ নেতা মং ওয়াইচিং জায়গাগুলো পুলিশপ্রধানকে নিয়ে দিয়েছিল। বিষয়গুলো নিয়ে কোনো ধরনের কথা না বলতে নিষেধ করা হয়েছিল, নয়তো মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানো হয়েছিল।

ত‌বে অভিযোগ অস্বীকার ক‌রে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লী‌গে‌র সভাপ‌তি মং ওয়াইচিং বলেন, সুয়ালকের মা‌ঝেরপাড়ায় বেনজীর আহ‌মে‌দের জমির পা‌শে আমার কিছু জমি রয়েছে। সেই সুবা‌দে এক‌দিন এক পু‌লিশ কর্মকর্তা এসে আমা‌কে বেনজীর আহ‌মে‌দের জায়গাগু‌লো দেখাশুনা কর‌তে ব‌লেন। আমি তাদের জমিগুলো দেখাশোনা করতাম।
কিন্তু লামার ডলুছ‌ড়ির টংগঝি‌রি এলাকায় জায়গা দখলের বিষ‌য়টি আমার জানা নেই।

সুয়ালক মৌজার হেডম্যান মংহ্যচিং এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

জেলা প্রশাসক শাহ মোজা‌হিদ উদ্দিন বলেন, বেনজীর আহ‌মে‌দের নামে বান্দরবান লিজের জায়গা বা জোর ক‌রে জায়গা দখল ক‌রে‌ছেন এমন কিছু জা‌না নেই। তথ্যটি সম্পর্কে বিস্তা‌রিত খবর নি‌য়ে ব‌্যবস্থা নেব।

 

উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮০১৬৭৪০৬২০২৩
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯
অফিস: ৩৯২, ডি আই টি রোড (বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিপরীতে),পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
যোগাযোগ: তাহিরুল ইসলাম, ০১৭৭৮০০৪৭০০ contact@banglahour.com
অফিসিয়াল মেইলঃ banglahour@gmail.com
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল