খোকন আঙ্কেল আমাকে পাখির বাসা দেখাবে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে হয়তো এমন সরল বিশ্বাস নিয়েই গিয়েছিল নয় বছরের ছোট্ট রাফি। কে জানত, এই ডাকে সাড়া দিয়েই সে চলে যাচ্ছে মৃত্যুর ফাঁদে।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আন্দালিব সাদমান রাফি হত্যাকাণ্ড এখন পুরো এলাকাজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
শিশুটির নির্মম মৃত্যুর বর্ণনা শুনে কেঁদেছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রতিবাদের ঝড়। এ ঘটনায় হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি, ফাঁসির দাবিতে মঙ্গলবার সকালে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার নিখোঁজ হয় মুক্তাগাছা রেসিডেন্সিয়াল মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আন্দালিব সাদমান রাফি। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি ও আশপাশে খোঁজ করেন। পরে এলাকায় মাইকিং করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে নিখোঁজ সংবাদ।
কিন্তু তখনও কেউ জানতেন না, ছোট্ট রাফি আর বেচে নেই।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেশী নূর মোহাম্মদ খোকন পাখির বাসা দেখানোর কথা বলে রাফিকে বাড়ির পেছনের একটি নির্জন পুকুরপাড়ে নিয়ে যান। চারদিকে বিল, নিস্তব্ধ পরিবেশ সেখানে মানুষের যাতায়াতও কম। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে রাফিকে ধাক্কা দিয়ে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। সাঁতার না জানা শিশুটি প্রাণ বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে পুকুরের পাড়ের দিকে চলে আসে।
তখনই খোকন নিজে পানিতে নামে। ছোট্ট রাফি ভেবেছিল, তাকে বাঁচাতেই পানিতে নেমেছেন খোকন আঙ্কেল। বিশ্বাস করে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। কিন্তু সেই মানুষটিই তার ঘাড় চেপে কয়েক মিনিট পানির নিচে ধরে রাখেন বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে এ সকল তথ্য।
পরে মৃত্যু নিশ্চিত হলে মরদেহ পুকুরে ফেলে রেখে বাড়িতে ফিরে যান তিনি। বাড়ি থেকে প্লাস্টিকের বস্তা, রশি ও বাঁশ নিয়ে গিয়ে রাফির মরদেহ বস্তাবন্দী করে পুকুরে বাঁশের খুঁটি পুতে তার সাথে বেদে লুকিয়ে রাখা হয়। সন্ধ্যার দিকে পরিবারের লোকজন যখন বিভিন্ন পুকুরে জাল ফেলে রাফিকে খোঁজাখুঁজি করছে তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি কৌশলে মরদেহ সরিয়ে নিজের বাড়ির পেছনের টয়লেটের ট্যাংকিতে রেখে দেন।
এ ঘটনায় নতুন মোড় আসে অভিযুক্তের মায়ের কথাতে । পুলিশ সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খোকনকে থানায় নিয়ে আসা হলে একপর্যায়ে খোকনের মা ছেলেকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে পুরো ঘটনার কথা বলে দেন। এরপর পুলিশ টয়লেটের ট্যাংকি থেকে রাফির বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঘটনার আগে রাফিকে ঢাকায় নিয়ে রাখার পরিকল্পনাও করেছিলেন খোকন। এ বিষয়ে তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে ওই বন্ধু শিশুটিকে রাখতে অস্বীকৃতি জানান। পরে রাফির নিখোঁজের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ওই বন্ধু খোকনের সঙ্গে হওয়া কথোপকথনের স্ক্রিনশট রাফির পরিবারের কাছে পাঠান। সেই সূত্র ধরেই পুলিশ সন্দেহভাজন খোকনকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
এদিকে রাফি হত্যার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকালে মুক্তাগাছা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়কসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
মানববন্ধনে মুক্তাগাছা রেসিডেন্সিয়াল মাদ্রাসা ও এমএন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষ অংশ নেন। সেখানে বক্তব্য দেন রেসিডেন্সিয়াল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাবিবুল হক শরীফ, আটানী বাজার শাখার প্রধান মাওলানা আফাজ উদ্দিন, নতুন বাজার মাদ্রাসা শাখার প্রধান আবু নোমান, এমএন স্কুলের অধ্যক্ষ মো: শামীমসহ স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।
বক্তারা বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা দ্রুত বিচার ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থীকে কাদতে দেখা যায়। কেউ হাতে রাফির ছবি, কেউবা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাড়িয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল রাফি হত্যার বিচার চাই, শিশুহত্যার ফাঁসি চাই আমরা নিরাপদ শৈশব চাই।
মাত্র নয় বছর বয়সী রাফি আর কখনো মাদ্রাসার ক্লাসে ফিরবে না। বই হাতে বন্ধুদের সঙ্গে হাসবে না। পাখির বাসা দেখতে যাওয়ার সরল বিশ্বাসই তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে দাড়ালো আর মুক্তাগাছার মানুষ এখন একটাই প্রশ্ন করছেন একটি শিশুর বিশ্বাসকে হত্যা করার এমন নির্মমতার বিচার কি দ্রুত হবে?

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
