জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন খুলনার কমিটি: স্থান পেলেন সমালোচিত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী জুয়েল।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) প্রকৌশল বিভাগের উপ-প্রধান প্রকৌশলী ও প্রেষণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হয়ে বর্তমানে খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আরিফুল ইসলাম জুয়েলের বিরুদ্ধে ভবন নির্মাণে ভয়াবহ অনিয়ম, অন্যায়ভাবে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে সহায়তা, অফিসে চরম ফাঁকিবাজি ও বিভাগীয় শাস্তিসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। আর এই বিতর্কিত কর্মকর্তা ও সাবেক সিন্ডিকেট সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পদে আসীন হওয়ার দীর্ঘ ৬ মাস পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও তদন্ত কমিটির নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কবি জীবনানন্দ দাশ একাডেমিক ভবনের (৩য় একাডেমিক ভবন) নির্মাণকাজে ভয়াবহ গাফিলতি ও অনিয়মের দায়ে তাকে ইতোপূর্বেই শাস্তির আওতায় আনা হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উক্ত ভবনের ৩৩৪১ ও ৩৩৪২ নম্বর কক্ষসহ একাধিক কক্ষে চলাচলের সময় অস্বাভাবিক কম্পন সৃষ্টি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির অনুসন্ধান ও ল্যাব টেস্টে ধরা পড়ে-নকশা অনুযায়ী মেঝের থিকনেস ও রডের বিন্যাস ঠিক ছিল না। উক্ত কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকাকালে প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম সাময়িক সময়ের জন্য বিদেশে অবস্থান করেন। দেশে ফিরে কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই বা পরীক্ষা না করেই অনুপস্থিতকালীন সময়ের পরিমাপ বইতে স্বাক্ষর করেন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অন্যায়ভাবে বিল পরিশোধে সহায়তা করেন, যা চরম নীতিবহির্ভূত।
এ ঘটনার জেরে ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে 'নির্বাহী প্রকৌশলী' পদ থেকে অবনমন করে 'সহকারী প্রকৌশলী' পদে নামিয়ে দেওয়া হয়। একইসাথে পরবর্তী ৫ বছর তার পদোন্নতি বা আপগ্রেডেশন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কেবল নির্মাণ ত্রুটি ও অনিয়মেই সীমাবদ্ধ নয়, তার বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও মারাত্মক নিয়মভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। গত ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে (স্মারক নং- খুবি/প্রশা-অভি-৮/৯৬(১৩)-২) জানানো হয়, নভেম্বর ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ডিজিটাল হাজিরা রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে-৫৪ কার্যদিবসের মধ্যে তিনি ৫৪ দিনই বিলম্বে অফিসে এসেছে এবং ৩০ দিন নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। গড়ে তিনি দিনে মাত্র ২.৮৬ ঘণ্টা কাজ করেছেন, যা সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ২০১৯ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল।
এছাড়া, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হল ভবনের নির্মাণকাজে অনিয়ম, কাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই বিল প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়, খুলনার অনুসন্ধানের তালিকায়ও তার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে, সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন কর্তৃক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে ঘোষিত খুলনা বিভাগীয় লোকাল কমিটি। গোপনীয়তা রক্ষা করে গঠিত উক্ত কমিটি প্রায় ৬ মাস পর অতি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসায় তোলপাড় শুরু হয়েছে স্থানীয় রাজনীতিতে। উক্ত কমিটিতে এমন একজন দণ্ডপ্রাপ্ত, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত কর্মকর্তাকে ‘সদস্য সচিব’ পদে বসানোর বিষয়টি জানাজানি হতেই তৃণমূলের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।
খুলনার স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে চরম নির্যাতন, জেল-জুলুম সহ্য করে যেসব নেতাকর্মী দলকে সংগঠিত রেখেছেন, তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং অবমূল্যায়ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শাস্তিপ্রাপ্ত ও বিতর্কিত একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে। দীর্ঘ ৬ মাস পর এই বিতর্কিত নিয়োগের কথা প্রকাশ পাওয়ায় জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাবমূর্তি স্থানীয়ভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী পরিষদের একাধিক সিনিয়র নেতা ও প্রবীণ বিএনপি নেতারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন-যেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত সংস্থায় সততা, মেধা ও ত্যাগের মূল্যায়ন হওয়ার কথা, সেখানে এমন একজন অপ-পেশাজীবীকে কীভাবে সদস্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হলো এবং তা দীর্ঘ ৬ মাস গোপন রাখা হলো, তা রহস্যজনক। এতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দলের যে কঠোর অবস্থান, তা সাধারণ মানুষের কাছে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
একের পর এক প্রশাসনিক শাস্তি, অফিসের সময়সূচি চরমভাবে লঙ্ঘন, দুদকের চলমান অনুসন্ধান এবং ৬ মাস পর কমিটি প্রকাশ্যে আসার পর বিএনপিতে তৈরি হওয়া তীব্র ক্ষোভের বিষয়ে প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সুনির্দিষ্ট কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন মহল এবং বিএনপির নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা অবিলম্বে এই বিতর্কিত কর্মকর্তাকে ফাউন্ডেশনের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে স্বচ্ছ ও ভাবমূর্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন কমিটি পুনর্গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
