ঢাকা, ৯ নভেম্বর ২০২৬, সোমবার, ২৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
banglahour গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল

English

মসজিদে নামাজ, পাশেই দুর্গাপূজা, শত বছরের সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত মুক্তাগাছা

সারাদেশ | রিপন সারওয়ার। জেলা প্রতিনিধি। ময়মনসিংহ।

(২ সপ্তাহ আগে) ২০ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার, ১২:৫৯ অপরাহ্ন

banglahour

 

এক পাশে মসজিদে নামাজ, অন্য পাশে দুর্গা মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য। মাঝখানে আটানী বাজার সড়ক। মসজিদের প্রধান ফটক আর পূজা মণ্ডপের প্রবেশপথ মুখোমুখি। একদিকে মুসল্লিরা আদায় করছেন নামাজ, অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ব্যস্ত দেবী দুর্গার আরাধনায়। ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা, উপাসনার রীতি আলাদা কিন্তু পাশাপাশি বসবাসের বন্ধন এক। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমনই এক দৃশ্য যেন বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

শহরের ঐতিহ্যবাহী মুক্তাগাছা বড় মসজিদের প্রধান ফটকের সামনেই পিলখানা এলাকায় বসবাস দেশওয়ালী সম্প্রদায়ের মানুষের। প্রায় ৫০টি পরিবারের ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০ মানুষের এই জনপদে এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১০৩ তম দুর্গাপূজা। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আয়োজনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে স্থাপনার রূপ, বেড়েছে শহরের পরিধি, কিন্তু দুই ধর্মের মানুষের পাশাপাশি বসবাসের ঐতিহ্য এখনো বহমান।

মুক্তাগাছা বড় মসজিদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, ওই বছর শহরের প্রাণকেন্দ্রে কয়েকজন মুসল্লির আসরের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে মসজিদটির সূচনা হয়। প্রথম নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা মঞ্জুরুল হক। পরের বছর, ১৯৪৯ সালে খান ইউসুফ সাঈদ মসজিদটির দ্বিতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তিন গম্বুজবিশিষ্ট দোতলা মসজিদটি এলাকার মুসল্লিদের ধর্মীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। ২০১১ সালে পুরোনো ভবনটি ভেঙে সুউচ্চ মিনারসহ চারতলা নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়।

অন্যদিকে মসজিদের সামনের পিলখানা এলাকার ইতিহাস জড়িয়ে আছে জমিদারি আমলের সঙ্গে। একসময় জমিদারদের হাতি রাখার জায়গা ছিল এই পিলখানা। জমিদারদের প্রয়োজনে উত্তর ভারত ও মধ্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দক্ষ শ্রমিক, কুশলী শিল্পী, পাহারাদার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মালীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে আনা হয়েছিল। অভিবাসিত এসব মানুষের মধ্যে উড়িষ্যার উড়িয়া সম্প্রদায়ের লোকজন পিলখানায় বসবাসের অনুমতি পান।

পরবর্তী সময়ে এই সম্প্রদায়ের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। ঠিক কোন বছর প্রথম পূজা শুরু হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১০৩ তম দুর্গাপূজা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আয়োজন এখন এলাকাবাসীর ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। পিলখানা এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক স্মৃতি, শিকড় ও দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক।

স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী বাসিন্দা গঙ্গা প্রসাদ দাস (৭৪)  বলেন, আমরা বংশপরম্পরায় এই এলাকায় বসবাস করছি। ছোটবেলা থেকেই মসজিদ ও পূজামণ্ডপকে পাশাপাশি দেখে আসছি। আমাদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য। আমরা চাই, এই আয়োজন ও সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার সম্পর্ক ভবিষ্যতেও বজায় থাকুক।

পিলখানা পূজা মন্ডপের সাধারণ সম্পাদক  রঞ্জন কুমার প্রসাদ   (৪৫) বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা এখানে পূজা করেছেন, আমরাও করছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই ঐতিহ্য ধরে রাখবে। ধর্ম যার যার, কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে আমরা একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে থাকতে চাই। এই সম্পর্কটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

মসজিদের পাশে দুর্গাপূজার আয়োজনকে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা দেখেন পাশাপাশি বসবাসের স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে। তাদের মতে, প্রত্যেকের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার পালনের অধিকারকে সম্মান জানানোই শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি।

মন্দিরের পাশে স্থানীয় বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান মোকলেছ  বলেন, আমরা মসজিদে নামাজ আদায় করি, আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। তারা তাদের ধর্ম পালন করবেন, আমরা আমাদের ধর্ম পালন করব। এখানে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবাই মিলেমিশে থাকলে সমাজে শান্তি বজায় থাকবে।

মুক্তাগাছা বড় মসজিদের পেশ ইমাম  হাফেজ মাওলালা মুফতী মুনিরুল ইসলাম বলেন,দীর্ঘ সময় ধরে এই এলাকায় দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করছেন। এই মসজিদের সাবেক ইমাম মৃত হাফেজ মাওলানা আবু তাহের (রহ: ) আমার বাবা তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ইমামতি করেছেন। আমরা এখানে একে অপরকে চিনি, জানি, প্রতিবেশী হিসেবে সবার সাথে আমাদের আত্মার সম্পর্ক। আযানের সময় হলে তারা তাদের পূজার সকল বাদ্যযন্ত্র বন্ধ করে দেন এবং নামাজ শেষে আবার তারা শুরু করেন। আমরা চাই আমাদের এই সম্পর্ক অটুট থাকুক।

মুক্তাগাছা বড় মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির আহবায়ক হাবিবুর রহমান খান রতন বলেন, মুক্তাগাছায় দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে পাশাপাশি বসবাস করছেন। শত বছরের এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবাইকে একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

মুক্তাগাছার এই সহাবস্থানকে সামাজিক সম্প্রীতির ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। তাদের মতে, ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

মুক্তাগাছা শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আলী ইদ্রিস বলেন, মুক্তাগাছার এই দৃশ্য আমাদের শেখায়, ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও মানুষ হিসেবে আমরা সবাই একে অপরের প্রতিবেশী। নিজের ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্যের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। এই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে, যাতে তারা সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। 
তার মতে, এ ধরনের ঐতিহ্য শুধু একটি এলাকার গর্ব নয় এটি বাংলাদেশের বহুধর্মীয় সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতা বজায় থাকলে ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
মুক্তাগাছার আটানী বাজার সড়কের এই জনপদ তাই কেবল একটি মসজিদ ও একটি পূজামণ্ডপের পাশাপাশি অবস্থানের গল্প নয়। এটি জমিদারি আমলের পিলখানা থেকে আধুনিক শহরে রূপান্তরের মধ্যেও টিকে থাকা এক সামাজিক ঐতিহ্যের গল্প।

মুক্তাগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণ চন্দ্র বলেন,আমাদের এই বাংলাদেশ যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো মুক্তাগাছা। রাস্তার পশ্চিমে মসজিদে মুসলমানেরা নামাজ আদায় করেন আর পূর্বে মন্দিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা উদ্‌যাপন করেন। শত বছরের এই ঐতিহ্য ধরে রেখেই মুক্তাগাছায়
বিগত বছরগুলোর মতো এবার ১১৫ টা পূজা মণ্ডপে এ রবছরও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্‌যাপিত হচ্ছে।

১৯৪৮ সালে যাত্রা শুরু করা মসজিদ, ১৯৪৯ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ২০১১ সালে নতুন ভবন নির্মাণের ইতিহাসের পাশে রয়েছে ১০৩ তম দুর্গাপূজার ধারাবাহিকতা।
মসজিদের সুউচ্চ মিনার আর পূজামণ্ডপের সাজসজ্জা, নামাজের একাগ্রতা আর ঢাকের ছন্দ, সব মিলিয়ে মুক্তাগাছার এই জনপদ যেন নীরবে বলে যায়, ধর্মীয় বিশ্বাস ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সম্প্রীতি ও মানবিকতার বন্ধন সবার। শত বছরের এই সহাবস্থান আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকুক শান্তি, শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।

সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন

সর্বশেষ

banglahour
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭৭৮০০৪৭০০
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯
বিশেষ প্রতিনিধিঃ তাহিরুল ইসলাম