মাত্র চার কোটি টাকায় ফের বিক্রি হয়ে যাচ্ছে রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ?
শিরোনামটি চোখে পড়ার সাথে সাথেই শ্রেণীভেদে পাঠকবৃন্দের মনে এতক্ষণে বিভিন্ন ভাষায় বাংলাদেশে প্রচলিত এমন একটি নিম্নমানের গালিও হয়তো বাদ নেই যা এ প্রতিবেদকের উদ্দেশ্যে উচ্চারিত হচ্ছে না।
কেউ কেউ প্রচন্ড রাগেও অশেষ ধৈর্য্যের সাথে দাঁতে দাঁত চেপে খিটমিট করছেন? ভাবছেন, এমন বদ্ধ-পাগল প্রতিবেদককে সামনে পেলে একটি চড়-থাপ্পরও ওর গাল-পিঠ মিস করে মাটিতে পড়তো না?
কিছু পাঠক হয়তো নিজেদের ফেসবুক ওয়ালে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রতিবদককে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে চাকুরি থেকে বের করে দেয়ার দাবি তুলে গণমাধ্যমের উর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।
তবে, প্রতিবদককে নামধারী, হলুদ কিংবা ভুয়া সাংবাদিকের তকমা লাগিয়ে তিরস্কারের প্রবনতা ও ধরণে ভিন্নমত থাকলেও, কারণ হিসেবে সকল পাঠকের মনে এই মূহুর্তে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, প্রতিবেদক কি জানেন না যে, চার কোটি তো দূরে থাক- চার হাজার কোটিতেও রাজধানীর কোন বাস টার্মিনাল বিক্রি সম্ভব নয়? গাবতলী আন্তঃজলা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল কারো ব্যাক্তিগত কিংবা পৈতৃক সম্পত্তি নয়? রাজধানীর গাবতলী,সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনালসহ দেশের প্রতিটি জেলায় অবস্থিত বাস টার্মিনালগুলোর সবই রাষ্ট্রীয় সম্পদ। কারো পক্ষে কখনোই বিক্রি করা সম্ভব নয়? জেনে থাকলে শিরোনামে "ফের বিক্রি হচ্ছে" উল্লেখ করলেন কোন আক্কেলে? তার মানে এর আগেও গাবতলী বাস টার্মিনাল বিক্রি হয়েছে? এত্ত বড় ঘটনা আমরা দেশবাসী একটিবারের জন্যেও জানলাম না?
কে-ও কে-ও ভাবছেন,ব্যাটা নিশ্চয়ই আওয়ামী পন্থী সাংবাদিক। কোনো গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে এমন ভুঁয়া সংবাদ প্রচার করে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এখনই তাকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আলোচিত ডজন খানেক বড়সড় মামলায় আসামী সাজিয়ে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো উচিৎ!
"জ্বী, সত্যি! একদিকে, যেমনি পাঠকবৃন্দের প্রতিটি মন্তব্যই সঠিক। পক্ষান্তরে, সংবাদের শিরোনাম, বিষয়, এমনকি ঘটনাও তেমনি সত্য।
কি? ফের শরীর তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো; তাই না? দয়া করে রাগ করবেন না। আসুন ঘটনাটি একটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি।
পকৃতপক্ষে, গাবতলী বাস টার্মিনাল কখনোই বিক্রি হয়নি। ফের কখনো হবেও না।
তবে বিক্রি হয়েছে বাস টার্মিনালটি কেন্দ্রীক দৈনন্দিন বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কৃত্রিম সিস্টেম এবং সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট চেয়ারসমুহ। যেই সিস্টেমে সিটি কর্পোরেশন কিংবা বিভিন্ন দপ্তর থেকে ডাক নেয়ার দোহাই দিয়ে এই বাস টার্মিনাল কেন্দ্রীক প্রতিদিন বেশুমার চাঁদাবাজি হয়ে থাকে।
একদিকে, রাজধানী ঢাকার সাথে দেশের উত্তর-দক্ষিণ বঙ্গের জেলাসমুহের সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা, পরিবহন ব্যবস্থায় ভূমিকা পালনে এই টার্মিনালটির গুরুত্ব অপরীসীম।
যেমন, পদ্মা সেতু নির্মাণ ও উদ্বোধনের আগ পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার সাথে পদ্মা পরবর্তী দক্ষিণ বঙ্গের ২১ জেলার বাসিন্দারা ঢাকা-আড়িচা সড়ক হয়ে এই টার্মিনালটিকেই ব্যবহার করতে হতো।
এখনো প্রতিদিন দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলো থেকে লাখ লাখ যাত্রী চলাচল ও প্রচুর পরিমানে কাঁচা-সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রাজধানীতে প্রবেশ করে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টার্মিনাল সংশ্লিষ্ট স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান,
সেই সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনব কায়দায় এখানে প্রতিদিন চলে বেশুমার চাঁদাবাজির রমরমা প্রতিযোগিতাও।
তিনি জানান, বিগত সরকারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সচিব গাজি হাফিজুর রহমান লিকু ও তার বাল্যবন্ধু শামীমের নেতৃত্বে প্রশাসন, স্থানীয় জাতীয় পার্টির নেতা হাজী মাসুমসহ আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-নেত্রীদের সক্রিয় সহযোগিতায় রাফি ট্রেডার্সের নামে টেন্ডার/ ডাক নিয়ে টার্মিনালের বিশাল চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছক স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের একজন রাজনৈতিক নেতা জানান, গত ৫ ই আগষ্ট অর্থাৎ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তোপের মুখে পড়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের সাথে সাথে সরকার পতনের কিছুদিন পরই প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার বিনিময়ে হাজী মাসুম নামে জাতীয় পার্টির এক নেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এই চাঁদাবাজির রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব।
সম্প্রতি, এনিয়ে নানা বিতর্কের জন্ম দিলে স্থানীয় একজন স্বনামধন্য পরিবহন ব্যবসায়ী আন্তঃজেলা বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের স্বঘোষিত সভাপতি এবং একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা পরিচয়ে দখলে নিয়ে কায়েম করেছেন এই সুবিশাল চাঁদাবাজির রামরাজত্ব।
তিনি আরো জানান, এই বিশাল চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে অন্তঃকোন্দল। এতে করে, যেকোনো সময় টার্মিনাল দলকে কেন্দ্র করে ত্রিমুখী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকার সৃষ্ট হয়।
ফলে, বাধ্য হয়ে একাধিক গোপন বৈঠক ডেকেও এপর্যন্ত এবিষয়ে কোনো সুরাহা মোলেনি। পরিশেষে, গোপন বৈঠকে উপস্থিত ঢাকা-১৪ আসনের শীর্ষ ব্যাক্তিবর্গের আলোচনা সাপেক্ষে চার কোটি টাকার বিনিময়ে একটি মহলকে এটার্মিনালটিকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হস্তান্তরের গোপন সিদ্ধান্ত গৃৃহীত হয়েছে বলে একটি খবর চাউর হয়েছে। যেকোনো সময় এই অর্থ বিনিময়ের মাধ্যমে প্রস্তাবিত প্রভাবশালী মহলকে টার্মিনালের সুবিশাল চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন একেকটটি নগর পরিবহন থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হারে সহস্রাধিক পরিবহন থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এচক্রটি। এছাড়া দূরপাল্লার প্রতিটি পরিবহন থেকে টার্মিনালে প্রবেশ ও ছেড়ে যাওয়া বাবদ আদায় করা হয় বিপুল অংকের চাঁদা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ টার্মিনালের একটি পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার বলেন, প্রতিটি ব্যনারের পরিবহনের কাউন্টার থেকেও এচক্রটি অবৈধভাবে চাঁদাবাজির মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছেন বেশুমার অর্থ।
বিভিন্ন সময়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাড়া বৃদ্ধি, টিকিট কালোবাজারী তো আছেই।
এছাড়া, মূল সড়কসহ টার্মিনালের আশপাশের সড়ক গুলোতে চলাচলাকারী ছোট-বড় বিভিন্ন পরিবহন থেকে সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালীের দোহাই দিয়ে দলে দলে বিভক্ত হয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার চাঁদাবাজিতে লিপ্ত রয়েছে।
এবিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিবহন শ্রমিক বলেন, এমন সিদ্ধান্তে এ টার্মিনাল কেন্দ্রীক ফের সৃষ্টি হলো বিপুল অবৈধ লেনদেনের সুযোগ। ফের ভারী হবে পাহাড় তুল্য কালো টাকার লেনদেনের হিসাবের পাল্লা। পরিবহন সংশ্লিষ্ট নিন্মশ্রেনীর বিভিন্ন পর্যায়ের গণপরিবহনে কর্মরত চালক-শ্রমিকদের রক্ত চোষা কিংবা শোষণের পূর্বের সিস্টেমই বহাল তবিয়্যতের সুযোগ সৃষ্টি হলো।
দেশে ৮০-২০ সিস্টেমই বহাল তবিয়্যতে বিখ্যাত লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর "লাল সালু" কিংবা আবু ইসহাকের সেই "জোক" রচনা কালেই জাতিকে জাতিকে দিলো? গাবতলী আন্তজেলা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল কেন্দ্রীক বিগত শ্বৈরশাসকের আমলে সৃষ্ট ও প্রচলিত এই শাসন-শোষণ ব্যবস্থা কি কোনোদিনও দূর হবেনা।
এবিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে হানিফ পরিবহনের কর্ণধার, আন্তঃজেলা বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের স্বঘোষিত সভাপতি, ঢাকা -১৪ আসনের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা মোঃ কফিল উদ্দীনের ব্যবহৃত ব্যাক্তিগত মুঠোফোনে বার বার ফোন করলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
