ঢাকা, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
banglahour গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল

English

মাদারগঞ্জের মেগা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প একনেকের ছাড়পত্র মিললেও মাঠে গড়ায়নি কাজ

সারাদেশ | আলী আকবর। জামালপুর প্রতিনিধি।

(১ ঘন্টা আগে) ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন

banglahour

ব্যবস্থাপনাগত সংকট ও অনিশ্চয়তায় আটকে আছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট আরপিসিএল সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট।

দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরপিসিএল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির কার্যক্রম কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে, ফলে প্রকল্পটি কবে শেষ হবে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।


জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পুনরায় অনুমোদন মিললেও বাস্তবে মাদারগঞ্জে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ এখনো থমকে আছে। প্রায় ৬০ শতাংশ ভৌত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর স্থগিত হয়ে যাওয়া মেগা প্রকল্পটির নির্মাণকাজ মাঠ পর্যায়ে দ্রুত শুরু করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পটি দ্রুত চালু হলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের লোডশেডিংয়ের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালি ইউনিয়নের কাইজার চরে ৩২৫ দশমিক ৬৫ একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলারের দাম বৃদ্ধি, পর পর কয়েকটি বন্যা, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিদেশি ঋণ ছাড়ের জটিলতায় কাজ ধীরগতির হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

সম্প্রতি চলতি বছরের আগস্ট মাসের ১৯ তারিখে একনেক সভায় সংশোধিত আকারে ১ হাজার ৬১২ কোটি ৭৩ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি পুনরায় অনুমোদন পায়। এর ফলে অর্থায়ন কিংবা নীতিগত আর কোনো বাধা অবশিষ্ট নেই। কিন্তু অনুমোদনের পরও দৃশ্যমান কোনো নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক প্রকল্পের বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান AFRY Switzerland Ltd-এর চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন মাসে শেষ হয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ দেড় বছর নতুন কোনো পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি আরও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরবর্তীতে চলতি বছরের ২৫ আগস্ট ATLANTA Enterprise নামের নতুন একটি বাংলাদেশী অনভিজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়, যা প্রকল্পের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।


এছাড়া আরপিসিএলের ১৫.০৯.২০২৫ এর চিঠির মাধ্যমে সৌর বিদ্যুত কেন্দ্রটির মূল ভারতীয় ইপিসি ঠিকাদার আমারারাজা ইল্কা প্রাইভেট লিমিটেড কে প্রকল্পের জন্য উপকরণ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত সংস্থাটির সমস্ত রকম প্রাপ্য বকেয়ার অর্থপ্রদান এখনও বাকী রয়েছে। ফলে প্রকল্পের সমস্ত নির্মাণকাজ কার্যত থেমে যায়।

অন্যদিকে, সৗের প্রকল্পের ভারতীয় ইপিসি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে দুটি বড় ব্যাচিং প্ল্যান্ট, জনবল, শ্রমিক, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য সম্পদ নিয়ে অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাজ বন্ধ থাকলেও এসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল সংরক্ষণে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য আর্থিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

ট্রান্সমিশন লাইনের প্রকল্পটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকায় তারা টাওয়ারের উপকরণগুলোকে চুরি থেকে রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আমদানি করা সামগ্রীগুলো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং সেগুলো চুরি ও মানের অবক্ষয়ের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

রোববার সরেজমিনে গেলে দেখা যায়- বন্ধ হওয়ার আগেই কাজের বড় একটি অংশ শেষ হয়ে গিয়েছিল। চরাঞ্চলকে নদীভাঙন থেকে রক্ষা করতে আরসিসি ব্লক বসানো, মাটি ভরাট, সৌর প্যানেলের ফ্রেম তৈরি এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য টাঙ্গাইলের ঘাটাইল গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ পর্যায়ে ছিল। এখন শুধু চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ শেষ করে উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষা।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির একটি বিশেষ মানবিক ও পরিবেশগত দিক রয়েছে। প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের পর ২৪১টি নদীভাঙন কবলিত ভূমিহীন পরিবারকে পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পে মানসম্মত পাকা বাড়ি তৈরি করে পুনর্বাসিত করার কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় পুনর্বাসন কার্যক্রমও এখনও সম্পূর্ণ হয়নি যা আরপিসিএল ভিন্ন একটি প্রকল্পের মাধ্যমে নিজস্ব অর্থায়নে দেশীয় প্রতিষ্ঠান দ্বারা করছে।

যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজার, মসজিদ ও কবরস্থানের সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি এটি একটি আংশিক 'কৃষি-সৌর' (Agrivoltaic) প্রকল্প-যেখানে সৌর প্যানেলের নিচে হলুদ, আদা ও কাঁচামরিচ চাষের পাশাপাশি বর্ষাকালে মাছ চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়- এখনো প্রকল্প এলাকাতে বাস করছে ৮/১০ টি পরিবার। তাদের মধ্যে আজিবর আকন্দের স্ত্রী মোছা: সবুরা খাতুনের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। সবুরা খাতুন বলেন-“আমরা স্বামী-স্ত্রীসহ আমাদের পরিবারে ২ ছেলে, ১ মেয়ে, শ্বাশুড়ী ও এক ছেলের বউ আছে। যেখানে এখন আমরা ৪ ঘরে থাকি। সেখানে  এই ৭জনের জন্য এক ঘর দিয়েছে। তাহলে আমরা কিভাবে যাবো বলেন?”

রফিকুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "একসময় এই চরে কিছুই ছিল না। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কল্যাণে  অবহেলিত চরের চেহারা বদলে গেছে। কিন্তু কাজটা বন্ধ হয়ে থাকায় আমাদের আশাও যেন আটকে আছে। অনুমোদন যেহেতু হয়ে গেছে, আমরা চাই কাল থেকেই কাজ শুরু হোক। বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে আমাদের অঞ্চলসহ পুরো দেশের লাভ হবে।"

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সিজার রহমান বলেন-“বাংলাদেশ সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০% নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।  যা ঘাটাইল বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হবে।   ফলে জামালপুর, টাঙ্গাইল ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পিক আওয়ারে যে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকে, তা কাটিয়ে উঠতে এটি বড় ভূমিকা রাখবে। এটি জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা বা তেল) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও  গ্রীন এনার্জি উৎপাদনে বাংলাদেশের একটি বড় পদক্ষেপ যা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কার্বন নির্গমন রোধ করবে এবং  জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সহায়ক হবে। তবে এর পরিবেশগত কিছু অসুবিধা বা চ্যালেঞ্জ ও রয়েছে। আইসোলেশন পারফেক্ট না হলে গ্রিডের পাওয়ার সিস্টেমে ডিসি কারেন্ট ঢুকে যেতে পারে যেটি গ্রিড বিদ্যুতের গুণমান হ্রাস করবে। এছাড়াও ২৫ থেকে ৩০ বছর পর যখন প্ল্যান্টটির মেয়াদ শেষ হবে, তখন সোলার প্যানেল বর্জ্যে পরিণত হবে। এগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করবে।”

সার্বিক বিষয়ে প্রকল্পটির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোবাইল ফোনে বলেন-‍“ প্রকল্পটির ক্ষুদ্র কাজগুলো চলমান রয়েছে। বাকি মূল কাজ খুব কম সময়ের মধ্যে শুরু হবে। এটি শুরু হতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। আর মূল কাজ শুরু হলে সকল সমস্যার সমাধান হবে এবং দ্রুত গতিতে কাজ সম্পন্ন করা হবে।

সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন

সর্বশেষ

banglahour
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭৭৮০০৪৭০০
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯
বিশেষ প্রতিনিধিঃ তাহিরুল ইসলাম