বৃষ্টি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অশেষ নিয়ামত। কিন্তু সেই বৃষ্টিই কখনো কখনো রাজধানীবাসীর জন্য অসহনীয় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক দিনের টানা বর্ষণে ঢাকা শহরের অনেক এলাকা ডুবে যায়, সৃষ্টি হয় ‘নগর বন্যা’র। অথচ এই বন্যা নদীর নয়—এটি নগরের পরিকল্পনাহীনতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণেরই ফল।
ঢাকার চারপাশে নদী থাকলেও বড় ধরনের বন্যা ছাড়া নদীর পানি নগরে ঢোকে না। এর কারণ শহররক্ষা বাঁধ। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর উত্তরা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত তুরাগ-ধলেশ্বরী-বুড়িগঙ্গা পাড় ধরে নির্মিত বাঁধ পশ্চিম ঢাকা রক্ষা করে। পূর্ব দিকে রয়েছে প্রগতি সরণি ও মৌচাক-নিকুঞ্জ হাইওয়ে—যা অনেকটাই বাঁধের কাজ করে।
এই অবকাঠামো ঢাকাকে ‘নদী বন্যা’ থেকে বাঁচালেও সৃষ্টি করেছে ‘নগর বন্যা’। কারণ, শহরের বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ নেই। পশ্চিমের বাঁধে মাত্র তিনটি সুইস গেট (গোরান, কল্যাণপুর, হাজারীবাগ) ও পূর্বে একটি মাত্র (রামপুরা)। এ ছাড়া রয়েছে কিছু পাম্প হাউস, যেগুলোর দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে শুধুই বাঁধ নয়—ঢাকার ভেতরের খাল, পুকুর, দীঘি, লেক, নিম্নভূমি, জলাশয়ও ছিল পানি ধারণের প্রাকৃতিক অবকাঠামো। সেগুলোর বেশির ভাগই গত ৩০ বছরে দখল ও ভরাট করে ফেলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর ঢাকায় ৫০টির বেশি খাল ছিল, এখন বড়জোর ১৫টি রয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও নালার চেয়ে ভালো নয়।
বিশেষত, ধোলাইখাল, পান্থপথের খালসহ অনেক প্রাকৃতিক জলাধারকে বক্স কালভার্ট করে রাস্তা বানানো হয়েছে। এর ফলে পানি যাওয়ার স্বাভাবিক পথ হারিয়ে গেছে।
তদুপরি, রূপনগর, রামপুরা, কল্যাণপুরের মতো বহু নিম্নভূমি ভরাট করে আবাসিক এলাকা বানানো হয়েছে। আশুলিয়া, উত্তরা, পূর্বাচল ও ডেমরাতেও একই অবস্থা। এমনকি সরকারি সংস্থাও এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত।
অথচ নগর পরিকল্পনায় ২০ শতাংশ জায়গা জলাধার হিসেবে সংরক্ষণ করার কথা বলা আছে। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ), ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান—সব জায়গায় এই নীতির কথা আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। নতুন পরিকল্পনাতেও জলাধার সংরক্ষণের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে কার্যকরতা নেই।
জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে হলে:
১. নতুন করে খাল, পুকুর, নিম্নভূমি ভরাট বন্ধ করতে হবে।
২. যেসব খাল এখনও জীবিত, সেগুলো উদ্ধার করে কার্যকর করা দরকার।
৩. বেসরকারি আবাসন কোম্পানির জলাভূমি দখল ও ভরাট বন্ধে কঠোরতা জরুরি।
৪. জলাধার সংরক্ষণে নগরবাসীর সচেতনতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
ঢাকা ওয়াসার হাতে কেবল ৩০-৩৫ শতাংশ এলাকার পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব। বাকি অংশ পড়ে আছে অন্য সংস্থার ওপর, যাদের মধ্যে নেই সমন্বয় কিংবা জবাবদিহিতা। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু প্রযুক্তি নয়, দরকার সদিচ্ছা, নীতি বাস্তবায়ন এবং আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয়।
অবাক করার বিষয় হলো, রাজনীতির বড় বড় ইস্যু নিয়ে যেভাবে আলোচনা হয়, সেভাবে নগর উন্নয়ন, খাল উদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয় না। অথচ এগুলো না হলে ভবিষ্যতের ঢাকা বসবাসযোগ্য থাকবে না। জলাবদ্ধতা আরও বাড়বে, শহর ডুবে থাকবে বছরের বড় একটি সময়জুড়ে।
তাই এখনই সময়—রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পিত, বাস্তবভিত্তিক ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার। না হলে বৃষ্টি আর আশীর্বাদ হয়ে থাকবে না—রূপ নেবে অভিশাপে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
