ঢাকা, ১ আগস্ট ২০২৬, শনিবার, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
banglahour গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল

English

ঢাকা এমআরটি লাইন–১ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর গণমাধ্যম প্রতিবেদন: বাস্তবচিত্র তুলে ধরেছে পাল্টা বিশ্লেষণ প্রতিবেদন

সারাদেশ | নিজেস্ব প্রতিনিধি

(৮ মাস আগে) ১৩ নভেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার, ২:০৬ অপরাহ্ন

banglahour

সাম্প্রতিক কিছু গণমাধ্যমে ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন–১ প্রকল্পের ব্যয়কে ভারতের ও অন্যান্য দেশের মেট্রোরেলের তুলনায় "অতিরিক্ত ব্যয়বহুল" বলে প্রচার করা হয়েছে—যা ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছে এক পাল্টা বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন।

প্রতিবেদনটি জানায়, ঢাকা এমআরটি লাইন–১ প্রকল্পের ব্যয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত, কারণ প্রকল্পটির প্রধান অংশ ভূগর্ভস্থ এবং অত্যন্ত জটিল নগর ও ভৌগোলিক পরিবেশে নির্মিত হচ্ছে। শুধুমাত্র প্রতি কিলোমিটার ব্যয় তুলনা করে প্রকল্পের প্রকৃত বাস্তবতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

 ১. ভিন্ন প্রকল্প কাঠামোর অযৌক্তিক তুলনা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ঢাকা এমআরটি লাইন–১ (যার বড় অংশ ভূগর্ভস্থ)–এর সাথে ভারতের অধিকাংশ উচ্চসেতু বা ভূমিতল মেট্রো প্রকল্পের তুলনা করা হয়েছে—যা প্রযুক্তিগতভাবে ভুল।
বিশ্বব্যাপী ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় সাধারণত উচ্চসেতু লাইনের তুলনায় তিন থেকে পাঁচগুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লি মেট্রোর তৃতীয় ধাপের ভূগর্ভস্থ অংশে প্রতি কিলোমিটার ব্যয় ছিল ১৮০–২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ঢাকার এমআরটি লাইন–১–এর সমমানের।

 ২. ঘনবসতিপূর্ণ নগর ও দুরূহ ভূ-প্রকৃতি

ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর (প্রায় ৪৭,০০০ জন/বর্গকিমি)। এখানে নির্মাণকাজে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ভূগর্ভস্থ ইউটিলিটি স্থানান্তর, পুনর্বাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। নরম দোআঁশ মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের কারণে টানেল নির্মাণ ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ ভারতের পাটনা বা পুনে শহরে তুলনামূলকভাবে কম।

 ৩. উন্নত নকশা ও প্রযুক্তিগত সংযোজন

৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন–১–এর মধ্যে ১৬.৩২ কিমি ভূগর্ভস্থ (বিমানবন্দর–কমলাপুর) এবং ১১.৪ কিমি উঁচু ট্র্যাক (নতুন বাজার–পুর্বাচল)।
এতে থাকবে পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, উন্নত CBTC সিগন্যালিং সিস্টেম, এবং বিমানবন্দর সংযোগ। নতুন বাজার স্টেশনটি ৬০০ মিটার দীর্ঘ একটি জটিল ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন, যা ভূগর্ভস্থ ও উঁচু লাইনকে সংযুক্ত করবে—এ ধরনের স্টেশন নির্মাণ ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

 ৪. আর্থিক ও ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপট উপেক্ষা

ভারতের মেট্রো প্রকল্পগুলো প্রায়ই রাষ্ট্রায়ত্ত জমি, দেশীয় ঠিকাদার ও কর রেয়াত সুবিধা পায়। অপরদিকে, ঢাকার এমআরটি লাইন–১ প্রকল্পটি জাইকা (JICA)–এর অর্থায়নে আন্তর্জাতিক FIDIC ও JIS মানদণ্ডে পরিচালিত, যেখানে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।
এর ফলে প্রাথমিক ব্যয় তুলনামূলক বেশি হলেও প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হয়।

 ৫. জাইকা টেন্ডারে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা

কিছু সংবাদে বলা হয়েছে যে জাইকা অর্থায়িত প্রকল্পে শুধুমাত্র জাপানি প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারে—যা সম্পূর্ণ ভুল।
জাইকা প্রকল্পে ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিটিভ বিডিং (ICB) পদ্ধতি বাধ্যতামূলক, যেখানে চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, ইতালি, তুরস্ক, কোরিয়া ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
তবে ভূগর্ভস্থ নির্মাণে উন্নত নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতার মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান সংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রধানত জাপানি কোম্পানিগুলো যোগ্যতা অর্জন করেছে।

 ৬. দীর্ঘমেয়াদি মূল্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব

এমআরটি লাইন–১ ১০০ বছরের নকশা আয়ুষ্কাল ধরে তৈরি হচ্ছে। এটি প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রীকে নিরাপদ, দ্রুত ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াত সুবিধা দেবে। ফলে যানজট ও বায়ুদূষণ হ্রাস পাবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে—যা প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় বহুগুণ অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে।

 ৭. বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা

২০১৯ সালে প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৬.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে—এটি কোনো স্থানীয় অদক্ষতার ফল নয়, বরং মহামারী-পরবর্তী বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও সরবরাহ সংকটের প্রতিফলন।
২০২০–২০২৩ সালে নির্মাণসামগ্রীর দাম বিশ্বব্যাপী ৩০–৬০% বেড়েছে; জ্বালানি ও পরিবহন খরচও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশি টাকার মূল্যহ্রাস (প্রায় ২৮%) এবং জাপানি ইয়েন ও ইউরোর ওঠানামা প্রকল্প ব্যয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

একই ধরনের ব্যয়বৃদ্ধি দেখা গেছে জাকার্তা এমআরটি (+২৩%), ব্যাংকক অরেঞ্জ লাইন (+১৮%), মুম্বাই মেট্রো লাইন–৩ (+২৫%), এবং লন্ডনের ক্রসরেল (+২৯%) প্রকল্পে।
অতএব, ঢাকার ব্যয়বৃদ্ধি বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ

প্রতিবেদনটি উপসংহারে বলেছে—ঢাকা এমআরটি লাইন–১ একটি অত্যাধুনিক, নিরাপত্তা-সংবেদনশীল প্রকল্প, যা এশিয়ার অন্যতম জটিল নগর পরিবেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর ব্যয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক।

এতে আরও বলা হয়েছে, ভিত্তিহীন তুলনামূলক প্রতিবেদন জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে, অথচ প্রকল্পটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি গণপরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের একটি অপরিহার্য অংশ।
সুতরাং, ঢাকা মেট্রোরেল লাইন–১ প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া উচিত—এটাই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই নগর জীবনের জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ।


সূত্র:
বিশ্বব্যাংক (২০২৩), আইএমএফ (২০২৪), ইউএনসিট্যাড (২০২২), ব্লুমবার্গ ইনডেক্স (২০২৩), বাংলাদেশ ব্যাংক (২০২৪), আইইএ (২০২৩), ফিডিক (২০১৭), জাইকা ও জেআইএস মানদণ্ড, জাকার্তা পোস্ট, ব্যাংকক পোস্ট, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইউকে ন্যাশনাল অডিট অফিস ইত্যাদি।

সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন

সর্বশেষ

banglahour
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮০১৬৭৪০৬২০২৩
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯