কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিজ দপ্তরে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত শিক্ষকের স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান বুধবার দিবাগত রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় মামলাটি করেন।
মামলায় আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমানকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এছাড়া আসমা সাদিয়ার সহকর্মী দুই শিক্ষক—সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান এবং উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় আরও অজ্ঞাত কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ। তিনি বলেন, “মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কাজ করছে।”
ঘটনার বিবরণ
গত বুধবার বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতির কক্ষে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন আসমা সাদিয়া (৩৫)। একই সময় কক্ষ থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে। পরে তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।
বৃহস্পতিবার নিহত শিক্ষকের মরদেহ কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এজাহারে যা বলা হয়েছে
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৮ সালে ফজলুর রহমান সমাজকল্যাণ বিভাগের তহবিল থেকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হওয়ার পর বিভাগের আগের আয়–ব্যয়ের হিসাব নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
আসমার স্বামীর অভিযোগ, সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস তাকে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করতে চাপ দিতেন। তবে আসমা বিভাগের অর্থ স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয়ের কথা বলায় তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। পরে ফজলুর রহমানসহ কয়েকজন বিভাগের অর্থ অপব্যবহার করতেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
এ কারণে ফজলুর রহমানকে কয়েক মাস আগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয় এবং বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকেও ১৮ ফেব্রুয়ারি অন্যত্র বদলি করা হয়। এর জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার প্ররোচনায় ফজলুর রহমান ধারালো অস্ত্র নিয়ে আসমা সাদিয়ার অফিসকক্ষে ঢুকে তাকে হত্যা করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফজলুরের লিখিত বক্তব্য
পুলিশ ও চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত হলেও ফজলুর রহমান ডাকলে সাড়া দিচ্ছেন এবং কলম দিয়ে লিখতে পারছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন বিভাগ থেকে বদলি করা এবং বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন একই বিভাগে কাজ করার পর বদলি হওয়া এবং আর্থিক সংকটে হতাশা থেকে তিনি হত্যার পরিকল্পনা করেন।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার বলেন, “আমাদের একজন সহকর্মী মারা গেছেন এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাঁর সঙ্গে এমন কোনো খারাপ সম্পর্ক ছিল না যে আমরা হত্যার নির্দেশ দেব। বিষয়টি তদন্তাধীন, তদন্তেই সব পরিষ্কার হবে।”
অপর শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, “আমি একজন মানুষ হিসেবে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। যদি আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তাহলে আমারও শাস্তি হওয়া উচিত।”
ময়নাতদন্তে যা মিলেছে
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের ময়নাতদন্তে আসমা সাদিয়ার শরীরে ধারালো অস্ত্রের ২০টির বেশি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম জানান, গলার নিচে গভীর আঘাতের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যা থেকে ধস্তাধস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
শিক্ষক হত্যার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা।
তারা ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হত্যাকারীর দ্রুত বিচার ও ফাঁসি, ঘটনার নেপথ্যে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা, ক্যাম্পাসে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, স্মার্ট আইডি ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
