দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠার ২১ বছরের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কমিশনবিহীন অবস্থায় রয়েছে সংস্থাটি। গত ৩ মার্চ তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের পদত্যাগের পর প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দিতে পারেনি সরকার। ফলে দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অভিযান পরিচালনা এবং উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কমিশন না থাকায় সংস্থাটির আইনি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রার্থী, অভিযোগকারী এবং সামগ্রিক দুর্নীতি দমন কার্যক্রমে।
অভিযোগের পাহাড়, নেই নিষ্পত্তি
দুদক সূত্রে জানা গেছে, কমিশন না থাকায় গত পাঁচ মাসে জমা পড়া প্রায় ১৩ হাজার অভিযোগ কার্যত নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় অভিযোগের সংখ্যা আরও বাড়ছে।
শুধু অভিযোগ যাচাই নয়, নতুন অনুসন্ধান অনুমোদন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, সম্পদ জব্দের অনুমতি, বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা এবং বড় ধরনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ চললেও কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন—এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখন আটকে আছে।
আইনি কাঠামো থাকলেও নেই নেতৃত্ব
দুদক একটি সাংবিধানিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সমন্বয়েই এর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কমিশন না থাকায় সংস্থাটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে কমিশনের ধারাবাহিক কার্যক্রম অপরিহার্য। দীর্ঘ সময় কমিশন শূন্য থাকলে শুধু তদন্ত নয়, জনমনে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
২১ বছরের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি
২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার পর বিচারপতি সুলতান হোসেন খানের নেতৃত্বে প্রথম কমিশন দায়িত্ব নেয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নানা কারণে সাতটির মধ্যে মাত্র তিনটি কমিশন পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়ে। সর্বশেষ মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনও নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে।
দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে প্রভাব
সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের অনুপস্থিতিতে নতুন বড় তদন্ত শুরু করা, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আদালতে প্রয়োজনীয় অনুমোদনসংক্রান্ত অনেক প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
এদিকে দুর্নীতির অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ায় অভিযোগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তদন্তের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সাংবিধানিক অধিকার ও জনস্বার্থ
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুগ বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং কমিশনের অনুপস্থিতি সেই অধিকার বাস্তবায়নে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে আইনবিদ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তাদের মতে, দুর্নীতিবিরোধী একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ সময় নেতৃত্বশূন্য থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি সুশাসন, জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
প্রশ্নের মুখে নিয়োগ প্রক্রিয়া
কমিশন গঠনে দীর্ঘ বিলম্বের কারণ সম্পর্কে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত একটি প্রতিষ্ঠানে কেন এত দীর্ঘ সময় নেতৃত্বের শূন্যতা থাকবে?
নতুন কমিশন কবে গঠন হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ কমিশন পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত জমে থাকা অভিযোগ, স্থগিত তদন্ত এবং দুর্নীতিবিরোধী নানা কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
