একটি দেশের গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ করে ঘটে না। তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, দমন-পীড়ন, নির্যাতন, দুর্নীতি, ও শাসকের জুলুম। ইতিহাস তাই বলে, অভ্যুত্থানের পেছনে থাকে অসংখ্য রক্তাক্ত সংগ্রাম আর বুকের তাজা রক্ত।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানও এমনি এমনি হয়নি। এটা কোনো ৩৬ দিনের হঠাৎ উত্তাল আন্দোলনের ফসল নয়। বরং এটি একটি ধারাবাহিক আন্দোলনের ফল, যার বীজ বপন হয়েছিল ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে।
তবে আজ প্রশ্ন আসে—যে আশা আর বিশ্বাস নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটেছিল, আমরা কি সত্যিই সেই আশার মর্যাদা দিতে পেরেছি? আমরা কথায় কথায় এটিকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করি, এটিকে "দ্বিতীয় স্বাধীনতা" বলে প্রচার করি। কিন্তু একটি অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থানকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সমতুল্য ঘোষণা করাকে আমি সমর্থন করতে পারি না।
কিছু প্রশ্ন যা মনকে নাড়া দেয়:
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিলেন, সবাই কি শহীদ হয়েছিলেন অথবা আহত হয়েছিলেন? যাঁরা জীবিত ছিলেন, সুস্থ ছিলেন—তাঁরা কি মুক্তিযোদ্ধা নন?
না, মোটেও না। যুদ্ধের ময়দানে জীবন উৎসর্গ করা যেমন বীরত্ব, তেমনি যুদ্ধ শেষে বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধারাও সমানভাবে গর্বের অংশীদার। সেই অনুযায়ী, সবাইকেই সম্মান ও সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দেয় যখন সেই সম্মান ভাতার তালিকায় নাতি-নাতনিরা ঢুকে পড়ে। এটা আপত্তির জায়গা।
২০২৪ সালের তথাকথিত "দ্বিতীয় স্বাধীনতা" বা "জুলাই যুদ্ধ"কে কেন্দ্র করে যে যোদ্ধা তালিকা তৈরি হচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে—শুধু আহত ও নিহতরাই ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন এবং তাঁদের পরিবার ভাতার আওতায় আসছেন।
প্রশ্ন হলো, আহত বা নিহত হওয়াটাই কি যুদ্ধে অংশগ্রহণের একমাত্র মানদণ্ড? আমরা যারা প্রাণে বেঁচে গেছি, আহত হইনি, আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি? তাহলে কি এই যুদ্ধের স্বীকৃতি পেতে হলে মরতে হতো, না হয় হাত-পা ভাঙাতে হতো?
সত্যি বলতে কি, এসব নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই। দেশের প্রয়োজনে আমি যে আন্দোলনের অংশ ছিলাম, সেটাই ছিল আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। বিনিময়ে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল না।
কিন্তু এখন যখন দেখি বিভিন্ন ভাতার তালিকা, সুযোগ-সুবিধা আর "জুলাই যোদ্ধা" ঘোষণার ঢালাও আয়োজন, তখন মুচকি হাসি আসে।
যদি সত্যিই "জুলাই যুদ্ধ" বলে কিছু থাকে, তবে যারা রাস্তায় ছিল, মিছিল করেছিল, পুলিশের লাঠিপেটা সহ্য করেছিল—সবাইকেই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। ৭১ আর ২৪-কে যদি তুলনাই করতেই হয়, তবে সবার জন্য মুক্তিযোদ্ধা ভাতার আদলে "জুলাই ভাতা"ও চালু করুন।
যদিও এটা বাস্তবতা নয়—পাগলেও জানে সেটা সম্ভব না। তাহলে প্রশ্ন আসে, শুধুমাত্র আহত-নিহতদের পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি ভাতা দেওয়া কি যুক্তিযুক্ত? এককালীন সহায়তা না হয়ে ভাতা ব্যবস্থা করাটা কি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে না?
এক আত্মজিজ্ঞাসা-
মাঝে মাঝে মনে হয়, জুলুমের নদী থেকে বাঁচার আশায় আমরা যেন স্বাধীনতার সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আবারও দুঃশাসনের গহ্বরে পড়ে গিয়েছি না তো?
লেখক- জাহিদুল ইসলাম তরুণ।
সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, টাঙ্গাইল জেলা গণ অধিকার পরিষদ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
