ঢাকা, ১৯ আগস্ট ২০২৬, বুধবার, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
banglahour গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল

English

কটিয়াদীতে তিন খাল পুনর্খনন, বছরে তিন ফসল ফলানোর স্বপ্ন কৃষকদের

সারাদেশ | মিয়া মোহাম্মদ ছিদ্দিক কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি।

(৩ ঘন্টা আগে) ১৯ আগস্ট ২০২৬, বুধবার, ২:১৭ অপরাহ্ন

banglahour


খালের স্বচ্ছ পানিতে উড়োজাল ফেলছেন কেউ কেউ। জাল টানতেই উঠে আসছে দেশীয় মাছ। আবার অনেকেই ধর্মজাল দিয়ে মাছ শিকার করছেন। বৃষ্টি হলে মাছ শিকারের ধুম পড়ে যায়। কেউ কেউ শখের বশে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছেন। অথচ একসময় এসব দৃশ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। এমন দৃশ্য দেখা গেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ও লোহাজুরী ইউনিয়নের সীমানাঘেঁষা পুনর্খনন করা কাটা খালে।

মাছের পাশাপাশি কৃষকদের মুখেও ফুটেছে হাসি, দেখা দিয়েছে বছরে তিন ফসল ফলানোর স্বপ্ন। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতিতে ফিরতে শুরু করেছে প্রাণ। সরকারের খাল পুনর্খনন উদ্যোগের বহুমুখী সুফলের বাস্তব চিত্র এখন দেখা যাচ্ছে এসব এলাকায়। তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখতে খালের দুই পাড়ে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

জানা গেছে, বহু বছর আগে এটি আড়িয়াল খাঁ নদের একটি শাখা ছিল। পরে ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা এটিকে মরা নদী হিসেবে চিনতেন। প্রায় ৪৮ বছর আগে, ১৯৭৮ সালের দিকে হেলিকপ্টারে এসে জালালপুরে খাল কাটা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান। তিনি নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কাজের সূচনা করেন। পরে লোকমুখে খালটির নাম হয় ‘কাটা খাল’। প্রায় ২০ বছর ধরে মাটি ভরাট ও ময়লা-আবর্জনা জমে পানিপ্রবাহ বন্ধ থাকায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল খালটি। সম্প্রতি এটি পুনর্খনন করা হয়েছে। ফলে আবারও পানিপ্রবাহ শুরু হয়েছে এবং এর সুফল পেতে শুরু করেছেন কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।


স্থানীয়দের তথ্যমতে, খালের আশপাশে প্রায় ৬১৮ একর কৃষিজমি রয়েছে। খালটি পুনর্খনন হওয়ায় লোহাজুরী পূর্বচর, অরিয়াধর, দশপাখি ও জালালপুর এলাকার বৃষ্টির পানি সহজেই নদীতে নামতে পারবে। পাশাপাশি পানিপ্রবাহ ও পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে এসব এলাকার কৃষকরা বছরে একাধিক ফসল ফলাতে পারবেন। কটিয়াদী উপজেলায় আরও দুটি খাল পুনর্খনন করা হয়েছে। এগুলো হলো—লোহাজুরী ইউনিয়নের ঝিরারপাড়-বাহেরচর খাল এবং বনগ্রাম ইউনিয়নের কুরহানি বিলের খাল।

সরেজমিন দেখা যায়, জালালপুরের কাটা খালে পানিপ্রবাহ বেড়েছে। কয়েকজনকে খালে মাছ শিকার করতে দেখা গেছে। খাল থেকে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানি তুলে দূরের জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। অতীতে বর্ষার পানি দীর্ঘদিন জমে থাকায় যেসব জমিতে ফসল হতো না, সেসব জমির পানি এখন খালে নেমে গেছে। ফলে সেখানে আবার চাষাবাদ শুরু হয়েছে। খালের দুই পাশের জমিতে ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষকরা। পাশাপাশি চাষ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সবজি। শুকনো মৌসুমে বাদাম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষের আগ্রহও তৈরি হয়েছে। অনেক পতিত জমিও এখন চাষের আওতায় আসছে।

বনগ্রাম ইউনিয়নের কুরহানি বিল থেকে সিংগুয়া নদী পর্যন্ত খালটিতে বৃষ্টি হলে পানিপ্রবাহ তৈরি হয়। এ সময় শত শত মানুষ ধর্মজাল দিয়ে ছোট মাছ শিকার করেন। খালটি পুনর্খননের ফলে প্রায় ৪০ বছর পর সেখানে পানির দেখা মিলেছে। এতে আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও আনন্দ দেখা গেছে। তবে লোহাজুরী ইউনিয়নের ঝিরারপাড়-বাহেরচর খালটি পুনর্খনন করা হলেও এখনও পুরোপুরি পানিপ্রবাহ তৈরি হয়নি। একটি স্থানে পুকুর থাকায় খালের দুই পাশের সংযোগ আটকে আছে। ফলে খালে পানি জমে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না কৃষকরা।

জালালপুর এলাকার কৃষক আলকাস মিয়া বলেন, ‘একসময় বোরো ধান ছাড়া অন্য মৌসুমি ফসল উৎপাদন করতে পারতাম না। বর্ষায় অনেক জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকত। এখন খালে পানি নেমে গেছে, ধানের চারা রোপণ করছি।’

একই এলাকার ষাটোর্ধ্ব কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘খালের পরিষ্কার পানিতে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে। আমার জমিতে অগ্রহায়ণী ধান রোপণ করছি। খালে পানি থাকলে বছরে তিনটি ফসল করতে পারব। আমার মতো শত শত কৃষকের জন্য এটা ভালো হয়েছে।’


মাছ শিকারি হাশিম বলেন, ‘এই যে বিশ বছর আগে জাল মারতাম, এতদিন বন্ধ আছিল। এখন আবার জাল মাইরা কয়ডা মাছ মাইরা খাইতাছি। মাছ ধরা তো ভুইল্যাই গেছিলাম। অহন আবার খালে পানি আইছে দেইক্যা জাল লইয়া নামছি।’

কৃষক সাইদুর রহমান মানিক বলেন, ‘খালটি খনন করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। এখন তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবার পুনর্খনন করে হাসি ফুটিয়েছেন।’

বনগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, ‘কুরহানি বিল থেকে সিংগুয়া নদী পর্যন্ত খাল পুনর্খননের ফলে এলাকার হাজারো কৃষক উপকৃত হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই শত শত মানুষ মাছ শিকার করতে নামছে। জীববৈচিত্র্য প্রাণ ফিরে পেল, মৃত খাল জেগে উঠেছে এখন।’

কটিয়াদী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বনগ্রাম ইউনিয়নের কুরহানি বিল থেকে সিংগুয়া নদী পর্যন্ত খাল পুনর্খননের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৫৫০ মিটার এবং জালালপুর ইউনিয়নে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাটা খাল থেকে অরিয়াধর পর্যন্ত খাল পুনর্খননের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৫০ মিটার। দুটি খাল প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ১ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার ৮৩৮ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১ টাকা। অব্যয়িত ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। দুটি খালের গড় অগ্রগতি ৯০.৯৪ শতাংশ।’

কটিয়াদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জালালপুর, বনগ্রাম ও লোহাজুরী ইউনিয়নে তিনটি খাল পুনর্খনন করায় কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এটি সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। শুকনো মৌসুমে খালের পানি ব্যবহার করে রবিশস্য উৎপাদন করে কৃষক লাভবান হতে পারবেন, বছরে তিনটি ফসল ফলানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও খালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘খালের দুই পাশে বৃক্ষ থাকলে ক্ষতি নয়; বরং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখতে খালপাড়ে বৃক্ষরোপণ জরুরি। তবে ডালপালা ছেঁটে রাখলে ফসল উৎপাদনে সমস্যা হবে না।’

 

 

সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন

সর্বশেষ

banglahour
banglahour
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মাইনুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭৭৮০০৪৭০০
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
ফোন: +৮৮ ০১৭ ১২৭৯ ৮৪৪৯
বিশেষ প্রতিনিধিঃ তাহিরুল ইসলাম