দাদন ব্যবসায়ীদের চড়া সুদের চাপে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন কৃষকসহ শত শত পরিবার। সুদে-আসলে টাকা শোধ করতে না পেরে অনেকেই ভিটেমাটি ছেড়ে এলাকাছাড়া, আবার অনেকে চেক ডিসঅনার মামলায় জড়িয়ে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। এমন অভিযোগ উঠেছে ঠাকুরগাঁও পৌরশহরের হাজীপাড়া মহল্লার সাবেক পৌর চেয়ারম্যান সোলাইমান আলী সরকারের স্ত্রী জেসমিন আক্তার বিজলীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগে জানা গেছে, অভাবের তাড়নায় সংসারের খরচ ও কৃষিকাজের ব্যায় মেটাতে চড়া শর্তে টাকা নেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কচুবাড়ি, সাসলা পিয়ালা ও মাদারগঞ্জসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষেরা। টাকা নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে দিতে হয় ফাঁকা স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেক। নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ না হলেই শুরু হয় দাদন ব্যবসায়ীদের কৌশল। ফাঁকা স্ট্যাম্প ও চেকে ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের টাকা বসিয়ে দিয়ে দায়ের করা হয় চেক ডিসঅনার মামলা। মামলার ঝামেলা আর সুদের চাকা ঘোরাতে গিয়ে বহু পরিবার এখন ঘরবাড়ি ও জমি জমা হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব।
অভিযোগে আরও জানা গেছে, দাদন ব্যবসায়ীর হাত থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয় ভাবে বসানো হয় সালিস বৈঠক, থানায় অভিযোগ, ঠাকুরগাঁও জেলা লিগ্যাল এইডে অভিযোগসহ নানা দেনদরবার। কিন্তু সব কিছুই যেন অসহায় হয়ে পড়েছে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে।
মাটিগাড়া গ্রামের লুৎফর রহমান দাদন ব্যবসায়ীর ভয়াল থাবা হতে রক্ষা পেতে ২০২২ সালে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সিনিয়র সহকারি জজের বরাবরে অভিযোগ দায়ের করেন। সেই সূত্র ধরে লিগ্যাল এইড অফিসার মীমাংসার জন্য উভয় পক্ষকে নোটিশ করেন। বাদীপক্ষ উপস্থিত হলেও বিবাদী পক্ষ জেসমিন আক্তার বিজলী (দাদন ব্যবসায়ী)কে হাজির করাতে পারেননি। পরে তিনি আপোষ-মিমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিস্পতি না হওয়া সম্পর্কিত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আবেদনকারী আপোষ-মিমাংসা করতে আগ্রহী হলেও অপরপক্ষ আগ্রহী নয়। বিবাদী পক্ষ মিমাংসা সভায় হাজির হন নাই। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কচুবাড়ি গ্রামের ভ‚ক্তভোগী শফিকুল ইসলাম প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও কোন সুরাহা পাননি।
ভ‚ক্তভোগী শফিকুল ইসলাম বলেন অভাবে পড়ে কৃষিকাজের জন্য জেসমিন আক্তার বিজলীর কাছে ফাঁকা স্ট্যাম্প ও চেক বন্ধক দিয়ে এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা নেই। এর বিনিময়ে প্রতিমাসে গুনতে হয়েছে আঠার হাজার টাকা। দীর্ঘদিন সুদের টাকা দেওয়ার পর আসল টাকা ফেরত দিতে চাইলে টালবাহানা শুরে করে। পরে জানতে পারি আমার বিরুদ্ধে ৮ লাখ টাকার চেক ডিসঅনার মামলা দেওয়া হয়েছে। লুৎফর রহমান বলেন আমি বিজলী আক্তারের কাছে ৯৭ হাজার টাকা নেই। আমি এর বিনিময়ে বছরে ২৬ মন ধান দিয়ে আসছি। কিন্তু পরে আমার কাছে বছরে ৪০ মন ধান দাবী করলে আমি দিশে হারা হয়ে পড়ি। পরে এক সময় আমার বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকার চেক ডিসঅনার মামলা দেয়।
ভ‚ক্তভোগী নজরুল ইসলাম বলেন আমার টাকার বিশেষ প্রয়োজন হলে বিজলী আক্তারের কাছে ২০২০ সালে এক লাখ টাকা হওলাদ নেই। লেনদেন চলতেছিল, হাওলাদের কিছু টাকা পরিশোধও করি কিন্তু হঠাৎ ২০২৫ সালে আমার বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকার চেক ডিসঅনার মামলা দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান আমার ভাই দাদন ব্যবসায়ী বিজলীর কারণে এলাকা ছাড়া হয়েছে। সে টাকা পরিশোধ করে দেওয়ার পর তার ফাঁকা স্ট্যাম্প ও চেক ফেরত পাচ্ছে না। সে তার ভয়ে এখন এলাকাছাড়া। শাসলা পিয়ালা গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন দাদন ব্যবসায়ীদের কারণে অনেকে বাড়ি ছাড়া, আবার অনেকে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। একই কথা জানান রোহান উদ্দীন।
যার বিরুদ্ধে অভিযোগ জেসমিন আক্তার বিজলী। তিনি বলেন আপনি সাংবাদিক আমার বাসায় আসবেন কেন ? যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তাদের নাম বলেন, তা না হলে এই নম্বর আদালতে দিব। এমনও হুমকি দেন তিনি।
"এ ধরনের আর্থিক লেনদেনগুলো থানা বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সালিশে সমাধান হওয়ার সুযোগ আছে বলে জানালেন আইনজীবী (এপিপি) রাহাদ জামিল। তিনি আরও জানান কেউ যদি উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে একাধিক মিথ্যা মামলা করেন, সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত বিচারিক প্রক্রিয়ায় সতর্কতার সাথে বিষয় গুলো বিবেচনা করছেন।"
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন লিখিত অভিযোগ পেলে অনিয়ম ও প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রæত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। "ব্যক্তিগত সমঝোতায় লেনদেন হওয়ায় আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা থাকে। তবে ভুক্তভোগীরা থানা বা আদালতে লিখিত অভিযোগ করলে প্রয়োজনিয় প্রতিকার পেতে পারেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
