চারপাশে দুর্গন্ধযুক্ত নর্দমার পানি। ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। বিষধর সাপ, পোকামাকড় আর নানা জীবজন্তুর অবাধ বিচরণ। এমনই এক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ একটি কুটির,যেখানে মাথা তুলে দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা, নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ও দুর্গন্ধময় সেই কুটিরেই কেটে গেছে এক নারীর জীবনের দীর্ঘ ১৫ বছর।
তিনি সালেহা বেগম। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে মানুষের চোখের আড়ালে, ঘরের অন্ধকারে অনেকটা নিঃশব্দেই জীবন কাটিয়েছেন তিনি। বাইরে বের হননি, কারও সঙ্গে কথা বলেননি। অভাব, অসহায়ত্ব আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে তার জীবন যেন থমকে ছিল।
সম্প্রতি ‘১৫ বছর ধরে কুটিরের অন্ধকারে লুকিয়ে রহস্যময় নারী’ শিরোনামে একাধিক জাতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সালেহা বেগমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। সংবাদটি প্রশাসনের নজরে আসার পর শুরু হয় তাকে উদ্ধারের উদ্যোগ।
অবশেষে সেই দীর্ঘ বন্দিদশার অবসান হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের নাচনাপাড়া এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ জরাজীর্ণ কুটির থেকে সালেহা বেগমকে বের করে আনেন তার ছেলে জিয়াউর রহমান। পরে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় তাকে চিকিৎসার জন্য কলাপাড়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্বামী আবুল কালামের মৃত্যুর পর সালেহা বেগমের জীবনে নেমে আসে চরম নিঃসঙ্গতা। এরপর থেকেই ওই জরাজীর্ণ কুটিরে তার বসবাস। দীর্ঘ ১৫ বছরে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেন। ঘরের বাইরে বের হওয়া তো দূরের কথা, কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতেন না।
তার মেয়ে লাকী বেগম মাঝেমধ্যে খাবার দিয়ে যেতেন। অন্যদিকে ছেলে জিয়াউর রহমান নিজেও মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় মায়ের দেখাশোনা করার মতো সামর্থ্য তার ছিল না। ফলে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই কাটে সালেহার জীবন।
সালেহাকে কুটির থেকে বের করে হাসপাতালে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। দীর্ঘদিন পর তাকে ঘরের বাইরে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেক এলাকাবাসী। তবে শুধু কুটির থেকে বের করে আনাই নয় সালেহার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় এবং মানবিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসা সহায়তা এবং একটি নিরাপদ নতুন ঘরের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
কলাপড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুজ্জাম বলেন, সালেহা বেগমের পাশে উপজেলা প্রশাসন থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দীর্ঘ ১৫ বছরের অন্ধকার, নিঃসঙ্গতা ও অবহেলার পর সালেহা বেগমের কুটিরের দরজা খুলেছে। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন,এই আলো কি তাকে একটি নিরাপদ, স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনে ফিরিয়ে দিতে পারবে? এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসনের উদ্যোগে সেই উত্তরটি এবার ইতিবাচকই হবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
