ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া ওয়্যারলেস রোডে বাংলাদেশ টেলিভিশনের আঞ্চলিক অফিস সংলগ্ন এলাকায় ১৯৮৭ সালে 'মেসার্স আলী এন্ড সন্স' (রপ্তানিমুখী নীট গার্মেন্টস-গেঞ্জী কারখানা) কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা এ.এম. ওয়াজেদ আলী। উদ্দেশ্য ছিল—নিজ এলাকায় শিল্প গড়ে তুলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান উন্নয়ন।
শুরুতে ভালোভাবেই চলছিল প্রতিষ্ঠানটি। ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক, বর্তমান বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেন তিনি। তবে নানা প্রতিকূলতা, যন্ত্রপাতির ভারসাম্যহীনতা ও আর্থিক সংকটে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে যেতে পারেনি। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় কারখানা, চলে যান কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকরা।
ব্যবসার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এ.এম. ওয়াজেদ আলী। ২০০৮ সালের ২ ডিসেম্বর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও দুই সন্তান রেখে মারা যান তিনি।
স্বামীর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরেন স্ত্রী মনোয়ারা বেগম। ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আলী এন্ড সন্স’ রুগ্ন শিল্পের আওতায় আসে। পর্ষদের সিদ্ধান্তে ত্রিশ দিনের মধ্যে পরিশোধের শর্তে মূল পাওনা নির্ধারণ করা হয় ২৫ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সোলেনামা আপসের মাধ্যমে পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেন মনোয়ারা বেগম। এর মধ্যে ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি ১৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে পারেননি তিনি। পরবর্তীতে ব্যাংক কতৃপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে পাওনা পরিশোধে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করেন। সেইসাথে ব্যাংক সমুদয় টাকা দেরিতে হলেও পরিশোধ হয়েছে বলে ব্যাংক জানায়।
তবে এরই মধ্যে ব্যাংক ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। মামলায় মৃত এ.এম. ওয়াজেদ আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়। এ.এম. ওয়াজেদ আলী মৃত্যুবরন করার পর মনোয়ারা বেগম প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হলে ব্যাংক তা অবগত হয়, তারপরও একজন মৃত ব্যক্তির নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা আসে কি করে? ব্যাংক গোপনে 'আলী এন্ড সন্স' প্রকল্পটি গ্রাস করার অসাধু উদ্দেশ্যে নিজের আয়ত্বে নেয়
বলে দাবি পরিবারের। পরে আদালতের একতরফা আদেশে প্রকল্পের সম্পদ নামজারি করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় ব্যাংক—এমন অভিযোগ মনোয়ারা বেগমের।
তার দাবি, ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করার পরও সম্পদ ফিরে পাননি তিনি। বরং বিষয়টি সমাধানের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা হয়নি। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। রিটটি আদালত গ্রহণ করে শুনানির জন্য রেখেছেন বলে জানান ভুক্তভোগী পরিবার।
মনোয়ারা বেগম বলেন, স্বামীর স্বপ্ন ছিল এই প্রতিষ্ঠানে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের পরও কেন সম্পদ ফেরত দেওয়া হচ্ছে না—এ প্রশ্নের সমাধান চান তিনি।
তার দাবি, বিলম্বকালীন সময়ের সুদ বাবদ ৫০ হাজার টাকাও পে-অর্ডারের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দিয়েছেন। ব্যাংক যৌক্তিকভাবে আরও কোনো অর্থ দাবি করলে সেটিও পরিশোধ করতে প্রস্তুত। সন্তানদের ওপর স্বামীর ঋণের দায় রেখে যেতে চান না তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের ময়মনসিংহ শাখা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আলী এন্ড সন্স’-এর বিষয়টি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। এ নিয়ে চলতি মাসের শুরুতে মনোয়ারা বেগম একটি আবেদন করেছেন। আবেদনটি কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনটি বিবেচনা করে ঋণ হিসাব নিষ্পত্তির সুযোগও থাকতে পারে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
