ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর বিদ্রোহী প্রার্থীরা ৭৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সামগ্রিক ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছেন। এর মধ্যে ২১টি আসনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। অন্যদিকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা সরাসরি জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনে জয়–পরাজয়ের সমীকরণে বড় ভূমিকা রেখেছেন বিদ্রোহীরা।
বিদ্রোহীর কাছে হার বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা
ময়মনসিংহ-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। তিনি পান ১ লাখ ১ হাজার ৯২৬ ভোট। তবে তাঁর চেয়ে ৬ হাজার ৩৩৯ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হন বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ সালমান ওমর। এ ফলাফল দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপি বা সমর্থিত প্রার্থীরা যেসব আসনে বিদ্রোহীদের কারণে পরাজিত হয়েছেন, সেগুলো হলো ময়মনসিংহ-১, দিনাজপুর-৫, কুমিল্লা-৭, কিশোরগঞ্জ-৫, টাঙ্গাইল-৩, চাঁদপুর-৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২।
জোটসঙ্গীদেরও ধরাশায়ী করল বিদ্রোহ
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি পান ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। একই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী সাইফুল আলম (নীরব) পান ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। দুজনের সম্মিলিত ভোট ৬০ হাজার ৮৩২ হলেও জয় পান জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন, যিনি পান ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট। ভোট ‘ভাগাভাগি’র কারণেই এ আসনে জয় হাতছাড়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব। তাঁকে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন বিএনপির বিদ্রোহী রুমিন ফারহানা।
সিলেট-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক পান ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। কিন্তু এখানে জয়ী হন ১১–দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আবুল হাসান, যিনি পান ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। একই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী মামুনুর রশিদ পান ৫৬ হাজার ৩৬৯ ভোট যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তের মনির হোসেন কাসেমী পান ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। জয়ী হন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিন, যিনি পান ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট। এখানে বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থী মোট ৪৪ হাজারের বেশি ভোট পাওয়ায় ফলাফলের সমীকরণ বদলে যায়।
দলবদল করেও মিলল না সাফল্য
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে নির্বাচন করেন রেদোয়ান আহমেদ। তাঁকে ৪৩ হাজার ১৮১ ভোটে হারান বিএনপির বিদ্রোহী আতিকুল আলম (শাওন)।
ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে নড়াইল-২ আসনে তৃতীয় হন। জয় পান জামায়াতের আতাউর রহমান। একই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী মনিরুল ইসলাম দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া মো. রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে তৃতীয় হন। সেখানে জয়ী হন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালিব। বিএনপির বিদ্রোহী মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ পান ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট, যা ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে।
বিদ্রোহে সুবিধায় জামায়াত
চট্টগ্রাম-১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীকে ১০ হাজার ৬২ ভোটে হারান জামায়াতের মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী মোহাম্মদ লেয়াকত আলী ৫৫ হাজার ৪৯২ ভোট পান।
পাবনা-৪ আসনে জামায়াতের আবু তালেব মণ্ডল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে ব্যবধান ছিল মাত্র ৩ হাজার ৭০১ ভোট। অথচ বিদ্রোহী জাকারিয়া পিন্টু পান ২৭ হাজার ৯৭০ ভোট।
বাগেরহাট-১ আসনেও দুই বিদ্রোহী প্রার্থীর মোট ১১ হাজার ৭৫০ ভোটের কারণে বিএনপির প্রার্থী অল্প ব্যবধানে হেরে যান জামায়াতের মশিউর রহমান খানের কাছে।
এ ছাড়া যশোর-৫, মাদারীপুর-১, ঢাকা-১৪, সাতক্ষীরা-৩, পাবনা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, বাগেরহাট-২ ও বাগেরহাট-৪ আসনেও একই চিত্র দেখা গেছে।
ময়মনসিংহ-৬ আসনে উভয় দলের বিদ্রোহী থাকলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হন জামায়াতের কামরুল হাসান। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আখতার সুলতানা নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পান।
রাজনৈতিক বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি শুধু স্থানীয় সমীকরণ নয়, জাতীয় পর্যায়ের ফলাফলকেও প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে যেখানে ভোটের ব্যবধান কম ছিল, সেখানে বিদ্রোহীদের ভোটই নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে।
দলীয় শৃঙ্খলা, প্রার্থী বাছাই ও জোট ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এই তিন বিষয়কে সামনে এনে ভবিষ্যৎ কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
