বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা কবিদের মধ্যে অন্যতম কবি তালিম হোসেন। কবিতায় বাস্তবতাকে নান্দনিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি জীবনদর্শন, সমাজসংস্কার, মানবিক মূল্যবোধ ও পরকালীন ভাবনাকে তিনি অসাধারণ শিল্পবোধে তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতার ভাষা, ছন্দ, গতি ও চিত্রকল্প পাঠকের হৃদয়ে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে।
নওগাঁর বদলগাছীর চাকরাইল গ্রামের কৃতী সন্তান কবি তালিম হোসেন ছিলেন একই সঙ্গে কবি, অনুবাদক, সম্পাদক, সংগঠক ও নজরুলচর্চার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচনায় দৈনন্দিন জীবনের অতি সাধারণ ঘটনাও কখনো কখনো হয়ে উঠেছে গভীর জীবনদর্শনের বাহক।
তাঁর ‘বাড়ি’ কবিতার একটি অংশে দেখা যায়—একটি বাড়ির দরজা পরিকল্পনা অনুযায়ী ছোট রাখার কথা থাকলেও রাজমিস্ত্রির বাস্তব অভিজ্ঞতায় তা বড় করতে হয়, কারণ ছোট দরজা দিয়ে খাটিয়া বের হবে না। নিত্যদিনের এমন একটি সাধারণ ঘটনাকে কবি জীবনের অনিবার্য পরিণতি—মৃত্যুর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এভাবেই তাঁর কবিতায় জীবনের আয়োজনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিরন্তন সত্য পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা তাঁর অমর কীর্তি
কবি তালিম হোসেনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অমর কীর্তি নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্মের গবেষণা, প্রচার-প্রসার, চর্চা ও সংরক্ষণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তিনি এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।
রাজধানীর মগবাজারের বেলালাবাদে প্রতিষ্ঠিত নজরুল একাডেমি পরবর্তীকালে নজরুল গবেষণা ও চর্চার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। নজরুলের গান ও সুরের বিকৃতি রোধে স্বরলিপি প্রণয়ন এবং তা প্রকাশের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সংগঠক হিসেবে তাঁর দক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবেই নজরুল একাডেমিকে বিবেচনা করা হয়।
সাহিত্য সম্পাদনা ও অনুবাদেও অবদান
কবি তালিম হোসেন তৎকালীন স্বনামধন্য সাহিত্যপত্র ‘মাহে নও’ সম্পাদনা করেছেন। পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবেও তিনি রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। তাঁর সাহিত্যকর্মে আধুনিক চিন্তা, মানবিকতা, নৈতিকতা ও জীবনবোধের পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার প্রকাশ ঘটেছে।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন জ্ঞানী, বিচক্ষণ, হৃদয়বান ও বন্ধুসুলভ মানুষ। লোকবিজ্ঞানী ড. আশরাফ সিদ্দিকী এবং কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
সাহিত্যিক পরিবারেও রেখে গেছেন উজ্জ্বল উত্তরাধিকার
কবি তালিম হোসেনের সহধর্মিণী ছিলেন দৈনিক বাংলা পত্রিকার মহিলা বিষয়ক পাতার সম্পাদিকা ও বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক মাফরুহা চৌধুরী। কবির মৃত্যুর পর তাঁর ‘কবিতা সমগ্র’ সম্পাদনা ও প্রকাশনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তিনি পালন করেন।
তালিম হোসেন ও মাফরুহা চৌধুরী দম্পতির সন্তানরাও শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁদের কন্যাদের মধ্যে নজরুলসংগীত শিল্পী ইয়াসমিন মুসতারী, শিল্পী পারভীন মুসতারী ও শবনম মুসতারী উল্লেখযোগ্য। তাঁদের দুই ছেলের মধ্যে একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী শাহরিয়ার চৌধুরী এবং অন্যজন বাংলাদেশ বিমানের বৈমানিক ক্যাপ্টেন হাসনাইন চৌধুরী।
পাঠাগার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জ্ঞানচর্চার প্রসার
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস ও জ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও কবি তালিম হোসেনের অবদান রয়েছে। নিজ জন্মভূমি বদলগাছীর চাকরাইল গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ‘রিজওয়ান লাইব্রেরি’ তাঁর জ্ঞান ও সাহিত্যপ্রেমের অন্যতম স্মারক। আজও এই পাঠাগার তাঁর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
মৃত্যু নয়, সৃষ্টিতেই অমর
১৯৯৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে বাংলা সাহিত্যের এই শক্তিমান কবির বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও তাঁকে পাঠকের কাছে জীবন্ত করে রেখেছে।
কবি তালিম হোসেনের কবিতায় যেমন জীবনের বাস্তবতা ও মৃত্যুচিন্তা একাকার হয়েছে, তেমনি তাঁর কর্মে ফুটে উঠেছে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে সাহিত্য সম্পাদনা, কবিতা রচনা, অনুবাদ ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা—বহুমাত্রিক কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি নওগাঁ তথা বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রেখে গেছেন অমলিন স্বাক্ষর।
নওগাঁর এই কৃতী সন্তান আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর কবিতা, সাহিত্যকর্ম, নজরুলচর্চা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে।
কবি তালিম হোসেনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
