‘তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন, সে জানে তোমারে ভোলা কি কঠিন’—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই পঙ্ক্তির মতোই যেন এক অদৃশ্য টানে বাঁধা পড়েছে এক স্কুলছাত্র আর একটি শালিক পাখি। খাঁচায় বন্দি নয়, দড়িতে বাঁধা নয়। মুক্ত আকাশেই উড়ে বেড়ায় পাখিটি। তবু সুযোগ পেলেই ফিরে আসে সাকিবের কাছে। কখনো কাঁধে, কখনো মাথায়, আবার কখনো হাতে বসে সঙ্গ দেয় প্রিয় বন্ধুটিকে।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের বেতাল গ্রামের বিল্লাল মিয়ার ছেলে সাকিব। স্থানীয় বেতাল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা বাড়ির বাইরে হাঁটাহাঁটি—সবখানেই যেন সাকিবের নীরব সঙ্গী এই শালিক।
মানুষ ও পাখির এমন অকৃত্রিম বন্ধুত্ব এখন স্থানীয়দের কাছেও বেশ কৌতূহলের বিষয়। তবে এই সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, পাখিটিকে কোনো খাঁচায় আটকে রাখা হয়নি। মুক্ত প্রকৃতিতে থেকেও নিজের ইচ্ছায় সাকিবের কাছে ফিরে আসে সে।
সাকিব যেখানে, শালিকও সেখানে
সরেজমিনে বেতাল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পাশের রাস্তার একটি দোকানে বসে আছে সাকিব। তার কাঁধে নিশ্চিন্তে বসে আছে শালিকটি। আশপাশে আরও কয়েকজন মানুষ বসে গল্প করছেন। কখনো সাকিবের হাতে, কখনো কাঁধে উঠে খুনসুটি করছে পাখিটি।
কিছুক্ষণ পর সাকিব দোকান থেকে উঠে রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলে পাখিটিও তার সঙ্গে সঙ্গে উড়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে আবার সাকিবের কাছে এসে বসে। কখনো গাছের ডালে বসে থাকে, আবার ডাকলেই যেন ছুটে আসে তার কাছে।
দৃশ্যটি দেখে পথচারী ও স্থানীয়দের অনেকেই থেমে তাকান। কারও কাছে এটি বিস্ময়ের, কারও কাছে আনন্দের। আর সাকিবের কাছে? এই শালিক এখন শুধুই পাখি নয়, পরিবারেরই একজন।
অসুস্থ অবস্থায় কুড়িয়ে পেয়েছিল সাকিব
সাকিব জানায়, প্রায় তিন মাস আগে অসুস্থ অবস্থায় শালিকটিকে কুড়িয়ে পায় সে। তখন পাখিটি ছিল বেশ ছোট। বাড়িতে এনে যত্ন নিতে শুরু করে। খাবার দেওয়া, পরিচর্যা করা আর পাশে থাকা—ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে পাখিটি।
সুস্থ হওয়ার পর একদিন তাকে মুক্ত করে দেয় সাকিব। কিন্তু উড়ে দূরে চলে যাওয়ার বদলে বারবার ফিরে আসে তার কাছে। হাত বাড়িয়ে দিলেই এসে বসে।
সাকিবের ভাষায়, “অনেক চেষ্টা করেও তাকে দূরে রাখতে পারিনি। এখন সে আমার ছায়াসঙ্গী। কখনো গাছে বসে থাকে, আবার কিছুক্ষণ পরই উড়ে এসে আমার কাছে বসে। ধীরে ধীরে আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেছে।”
স্থানীয়দের কাছেও অন্যরকম এক দৃশ্য
বেতাল গ্রামের বাসিন্দা ও পশুচিকিৎসক মোস্তাকুর রহমান আরমান প্রায়ই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন। তাঁর চোখেও পড়েছে সাকিব ও শালিকের এই বন্ধুত্ব।
তিনি বলেন, “প্রায়ই দেখি শালিকটি সাকিবের কাঁধে বসে আছে। সাকিব কোথাও গেলে পাখিটিও তার সঙ্গে সঙ্গে যায়। বিষয়টি দেখতে আমাদের খুব ভালো লাগে। মনে হয়, পাখিটিও সাকিবের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তা ও শান্তি খুঁজে পেয়েছে।”
এলাকার বাসিন্দা উসমান বলেন, “সাকিবের সেবাযত্ন আর ভালোবাসা পেয়েই পাখিটি তাকে আপন করে নিয়েছে। পাখি আর মানুষের বন্ধুত্ব অনেক পুরোনো। একটু সহানুভূতি ও ভালোবাসা পেলেই প্রাণীরা মানুষকে আপন করে নিতে পারে। এই শালিক আর সাকিবের সম্পর্ক তারই সুন্দর উদাহরণ।”
প্রকৃতির নিয়মে শালিকের ঠিকানা হওয়ার কথা গাছের ডাল, ঝোপঝাড় আর মুক্ত আকাশ। কিন্তু ভালোবাসার টানে সে বেছে নিয়েছে আরেকটি ঠিকানা—সাকিবের কাঁধ।
খাঁচার শিকল নয়, কোনো বাধ্যবাধকতাও নয়। শুধু মায়া আর ভালোবাসার টানেই প্রতিদিন ফিরে আসে সে। আর সাকিবও অপেক্ষায় থাকে তার ছোট্ট ছায়াসঙ্গীর জন্য।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.উসমান গনি বলেন, মানুষের সঙ্গে পশুপাখির এমন সম্পর্ক খুবই বিরল। সাকিব শালিক পাখির প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন,তারই ফলস্বরূপ পাখিগুলো তাদের পোষ মেনেছে। ছোট থেকে কোনো পশুপাখিকে আদর ভালোবাসা দিয়ে লালন পালন করলে পোষ মানে। সাকিবের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমনই হয়েছে। পাখিগুলো তাদের বাবা-মা মনে করেছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
