ফরিদা পারভিন বাংলাদেশের অন্যতম একজন লোকসংগীত শিল্পী। তিনি লালনগীতির জন্য বেশি জনপ্রিয়। ‘লালনকন্যা’ ও ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ নামেও তিনি পরিচিত। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
ফরিদা পারভীন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের শাঔঁল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দেলোয়ার হোসেন ও রৌফা বেগম দম্পতির সন্তান ফরিদা পারভীন। তার বাবা ছিলেন একজন চিকিৎসক।
তার স্কুল জীবনের সূচনা হয়েছিল মাগুরায়। তিনি কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার মীর মোশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় (বর্তমান সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়) এবং মেহেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কুষ্টিয়ার মীর মোশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৪ সালে কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ফরিদা পারভীন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৬-৭৯ সালে অনার্স সম্পন্ন করেন।
ফরিদা পারভীনের গানের হাতখড়ি মাগুরা জেলায়। মাগুরায় তিনি ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে গান শেখা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি কুষ্টিয়ায় ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস এবং ওসমান গণি'র কাছে ক্ল্যাসিক্যাল গান শেখেন। প্রায় ছয়-সাত বছর তানপুরার সঙ্গে ক্ল্যাসিক্যাল চর্চা করবার পর তিনি নজরুল সংগীত শিখতে শুরু করেন। তার নজরুল সংগীতের প্রথম গুরু হচ্ছেন কুষ্টিয়ার ওস্তাদ আবদুল কাদের। তিনি মেহেরপুরে মীর মোজাফফর আলী'র কাছেও নজরুল সংগীত শেখেন। স্বরলিপি দিয়ে নজরুলের গান হারমোনিয়ামে তোলার কাজটি তিনি ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলী'র কাছেই প্রথম শেখেন। ১৯৬৮ সালে নজরুল সংগীত শিল্পী হিসেবে রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত হন তিনি। সেখানে তাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন গুরু মোকছেদ আলী সাঁই। ১৯৭৩ সালে ফরিদা তাদের পারিবারিক বন্ধু গুরু মোকছেদ আলী সাঁই এর কাছে 'সত্য বল সুপথে চল' গান শেখার মাধ্যমে লালন সাঁইজির গানের তালিম নেন। মোকছেদ আলী সাঁইয়ের মৃত্যুর পর তিনি খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছে লালন সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করেন।
ফরিদা পারভীন শুধু লালনের গান নয়, তিনি একাধারে গেয়েছেন আধুনিক এবং দেশাত্মবোধক গান। তার গাওয়া আধুনিক, দেশাত্মবোধক কিংবা লালন সাঁইয়ের গান সমানভাবেই জনপ্রিয়। তার গাওয়া গানের মধ্যে 'এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদীর তটে' 'তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম', 'নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে প্রেমের কী সাধ আছে বলো', 'খাঁচার ভিতর', 'বাড়ির কাছে আরশি নগর' ইত্যাদি গান অনেক বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ফরিদা পারভীন ১৯৮৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন। অন্ধ প্রেম চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য ১৯৯৩ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ নারী সংগীত শিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৮ সালে তিনি ফুকুওয়াকা এশীয় সাংস্কৃতিক পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া তিনি সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ও অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার লাভ করেন।
ফরিদা পারভীন ২০২৪ সালে কিডনী সংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হন। ৫ জুলাই ২০২৫ সালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজধানীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে তাকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়।
২০২৫ শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ১০ সেপ্টেম্বর তার অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ১৫ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে থাকাকালীন ফরিদা পারভীন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কিংবদন্তি সংগীত শিল্পী ফরিদা পারভীনের মৃত্যু বার্ষিকীতে বাংলা আওয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
