মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজন সমন্বিত সেবা, ধারাবাহিক সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো বিষয় নয়। এটি একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা, যা মানবাধিকার, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। সহিংসতার ঘটনা জানানো, জরুরি চিকিৎসা দেওয়া এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু এসব উদ্যোগই একজন ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কিংবা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না।
কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ভুক্তভোগীদের জন্য চিকিৎসাসেবা, মনোসামাজিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ, নিরাপদ আশ্রয় এবং পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রে তাঁদের মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
২০১৭ সাল থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে পেশাগতভাবে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে আমি উপলব্ধি করেছি, সুরক্ষা নীতিমালার কার্যকারিতা শুধু প্রতিষ্ঠান থাকার ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে ভুক্তভোগীদের প্রয়োজন ও সমস্যার সমাধান করতে পারছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের গল্প
২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)-এ দায়িত্ব পালন করেছি। এই সময়ে সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুরা সহায়তা নিতে গিয়ে কী ধরনের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হন, তা সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছে।
ওসিসিতে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের সেবা সমন্বয়ের কাজে যুক্ত ছিলাম। তাঁদের মধ্যে চা-বাগানে কর্মরত এমন নারীও ছিলেন, যাঁরা শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা এবং অন্যান্য নির্যাতনের শিকার নারীরাও সহায়তা নিতে এসেছেন।
প্রতিটি ঘটনার পেছনে ছিল ভিন্ন ভিন্ন মানবিক বাস্তবতা। কারও প্রয়োজন ছিল জরুরি চিকিৎসা, কারও প্রয়োজন নিরাপত্তা, আবার কারও সামনে ছিল পারিবারিক চাপ, আর্থিক সংকট কিংবা সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা।
আমি উপলব্ধি করেছি, শারীরিক আঘাতের দৃশ্যমান চিহ্নই একজন ভুক্তভোগীর কষ্টের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। মানসিক আঘাত, সামাজিক stigma বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক চাপ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ আরও কঠিন করে তোলে। শিশুদের ক্ষেত্রে নির্যাতনের প্রভাব তাদের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এসব অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, প্রতিটি ভুক্তভোগীর সঙ্গে সংবেদনশীলতা, সহমর্মিতা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা কতটা জরুরি। তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। সহায়তা নিতে এসে যেন কেউ দ্বিতীয়বার অপমান বা হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো, প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন ও পরিস্থিতি আলাদা। তাই নিরাপত্তা, মর্যাদা, সম্মতি এবং ব্যক্তিগত অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েই সহায়তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কেন সমন্বিত সেবা জরুরি
ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জরুরি বিভাগ থেকে কোনো ভুক্তভোগী ওসিসিতে রেফার হলে তাঁর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করার কাজে আমি যুক্ত ছিলাম। পরিস্থিতি অনুযায়ী মনোসামাজিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ, পুলিশি সহযোগিতা এবং অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হতো।
এ ধরনের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সহিংসতার পরিণতি মোকাবিলার দায়িত্ব কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
একজন ভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সহায়তা, আইনি সহযোগিতা এবং পুনরায় নির্যাতনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। কারও কারও প্রয়োজন হয় আর্থিক সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় কিংবা সামাজিক পুনর্বাসন।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে, তাহলে ভুক্তভোগীকে জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একা পথ চলতে হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং দায়িত্বের অস্পষ্টতা প্রয়োজনীয় সেবা ব্যাহত করতে পারে।
তাই সমন্বিত সেবা বলতে শুধু বিভিন্ন ধরনের সেবা চালু রাখাকে বোঝায় না। বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ, দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট বণ্টন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
পরিবার বা সমাজের কোনো হস্তক্ষেপ যেন ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যৌন সহিংসতা বা গুরুতর নির্যাতনের ঘটনায় সামাজিক সমঝোতা কিংবা চাপ প্রয়োগ করে আপস করানো ভুক্তভোগীকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ ধরনের প্রতিটি উদ্যোগ অবশ্যই প্রচলিত আইন মেনে এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও সম্মতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত।
জরুরি বিভাগের পরও সুরক্ষা ও সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে
আমার পেশাগত অভিজ্ঞতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, একজন ভুক্তভোগীর চিকিৎসা শুরু হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁর সহায়তার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার পরও দীর্ঘদিন চিকিৎসা, মানসিক কাউন্সেলিং, আইনি সহযোগিতা এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকে।
ওসিসিতে দায়িত্ব পালনের সময় ফলোআপ বা পরবর্তী খোঁজখবর নেওয়া সেবা সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। নির্ধারিত রেজিস্টারে যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা হতো এবং পরবর্তী সময়ে টেলিফোনের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের অবস্থা ও অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হতো।
এ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, ধারাবাহিক সেবা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ফলোআপের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর সম্মতি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে কোনো যোগাযোগের কারণে যদি তাঁর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে সে বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
কার্যকর ফলোআপ ব্যবস্থার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট ভূমিকা, নিয়মিত কেস ম্যানেজমেন্ট, নিরাপদ তথ্য সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ থাকা জরুরি।
জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার পর একজন ভুক্তভোগীকে যেন পুরো সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে একা লড়াই করতে না হয়, সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।
সেবা আছে, কিন্তু অনেকের নাগালের বাইরে
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দেখেছি। তা হলো, বিভিন্ন ধরনের সেবা চালু থাকলেও অনেক ভুক্তভোগীর পক্ষে বাস্তবে সেই সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
আর্থিক সংকট ছিল অনেকের জন্য বড় বাধা। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার বাইরেও তাঁদের প্রয়োজন হতো পরবর্তী চিকিৎসা, যাতায়াত ব্যয়, নিরাপদ আবাসন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য আর্থিক সহায়তা।
কিন্তু ওসিসির পক্ষে সব ধরনের আর্থিক সহায়তা সরাসরি দেওয়া সম্ভব ছিল না।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে হাসপাতালের সমাজসেবা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্ভাব্য সহায়তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতাম। কখনো সহায়তা পাওয়া যেত, আবার কখনো বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না।
আইনি সহায়তার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল। জনবল সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কখনো কখনো প্রয়োজনীয় সহায়তা সময়মতো নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ত। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ঘটনার পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্নতা দেখা যেত।
এসব অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসে: কোনো সেবা চালু থাকলেই যে একজন ভুক্তভোগী সহজে সেই সেবা পাবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।
আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত জনবলের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্বল সমন্বয়ের কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। আগে থেকেই মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মানুষের জন্য এসব বাধা আরও বেশি কষ্ট ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তোলে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন
বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের বিষয় তুলে ধরে।
প্রথমত, রেফারেল ও ফলোআপ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। সদর হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল , সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, পুলিশ, আইনি সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, মনোসামাজিক সেবাদানকারী সংস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একজন ভুক্তভোগীকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়াই রেফারেল কার্যক্রমের সফলতা নয়। তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়েছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আর্থিকভাবে অসচ্ছল ভুক্তভোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা আরও সহজলভ্য করতে হবে। চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। আর্থিক সংকট যেন কারও নিরাপত্তা, সহায়তা কিংবা ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা না হয়।
তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল, সম্পদ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারীদের নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংবেদনশীল, গোপনীয়তা-সম্মত এবং মানসিক আঘাত সম্পর্কে সচেতন সেবা প্রদানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে বয়সোপযোগী সেবা এবং তাদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
চতুর্থত, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি শুধু কার্যক্রমের সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। কতটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, কতজনকে রেফার করা হয়েছে কিংবা কতটি প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে, শুধু এসব পরিসংখ্যান দিয়ে সুরক্ষা ব্যবস্থার সফলতা নির্ধারণ করা যায় না। সেবা কত দ্রুত পাওয়া গেছে, তা কতটা সহজলভ্য ছিল এবং ভুক্তভোগীর প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, সেসব বিষয়ও মূল্যায়ন করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রতিটি কার্যক্রমে ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজন ও যথাযথ অনুমোদন ছাড়া তা অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। গোপনীয়তা রক্ষা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি ভুক্তভোগীর সুরক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ।
ভুক্তভোগীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠুক সুরক্ষা ব্যবস্থা
মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝিয়েছে, কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু একটি ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানালেই হবে না। এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ভুক্তভোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন, তাঁদের পুনর্বাসন নিশ্চিত হবে এবং তাঁদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা ও জাতীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে। সেবাদানকারীরা বাস্তবে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন, সেগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরা হলে আরও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হলে প্রতিরোধ, জনসচেতনতা, কার্যকর আইন প্রয়োগ, সহজলভ্য সহায়তা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সহিংসতার শিকার একজন নারী বা শিশুর জন্য সময়মতো মানবিক সহায়তা পাওয়া নিরাপদ জীবনে ফিরে আসার প্রথম সুযোগ হতে পারে। তাই সুরক্ষা ব্যবস্থার সফলতা শুধু একটি ঘটনার কত দ্রুত সমাধান হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, একজন ভুক্তভোগী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন কি না, নতুন করে হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার না হয়ে ন্যায়বিচার চাইতে পারছেন কি না এবং মর্যাদার সঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারছেন কি না।
একজন ভুক্তভোগী কখনোই শুধু একটি মামলা বা পরিসংখ্যান নন। তিনি একজন মানুষ। তাঁর প্রয়োজন নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং সহিংসতামুক্ত মর্যাদাপূর্ণ জীবন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত নিউজ পোর্টাল
